ভ্রমণপিপাসু আলোকচিত্রী সাজ্জাদ খান রনিসহ হবিগঞ্জের কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে নিসর্গ গেস্টহাউস থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে টাওয়ারের সামনে চলে এলাম। এখানকার লেকটি একেবারেই ছোট নয়। লেকের পাড় ধরে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। একটি বৃহৎ কাঠবিড়ালি (Malayan Giant Squirrel) দেখে রনি দাঁড়িয়ে গেল। আমিও দাঁড়ালাম। ওর বেশ কয়টি ছবি তুলে সামনের দিকে এগোলাম। এগিয়ে যেখানে এলাম সেখানে বেশ ঘন জঙ্গল। বেশকিছু পুরোনো বড় গাছ রয়েছে এখানে। খানিকটা সামনে এগোলেই বনের শেষ প্রান্তে লেক। লেকে হাঁসজাতীয় কোনো পাখি আছে কিনা দেখতে হবে। কাজেই ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সামনে এগোলাম। আমাদের হাঁটার শব্দে কিনা জানি না, হঠাৎ করে যেন দৈত্যকায় একটা পাখি বাঁ দিক থেকে উড়ে গিয়ে ডান দিকের বড় গাছটার ডালে বসল। পেছন পেছন আরেকটি পাখি এলো। হঠাৎ ওদের ওড়াউড়িতে অনেকটা ভূত দেখার মতো ভয় পেয়ে গেলাম। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখলাম। কিন্তু শাটারে ক্লিক করার আগেই একটি ভূতুড়ে পাখি উড়ে চলে গেল। দ্বিতীয় পাখিটি ওড়ার আগে তিনটি ক্লিক করতে পারলাম। নতুন একটি পাখির ছবি নিয়ে মনের আনন্দে লেকের পাড়ের দিকে এগিয়ে গেলাম। সর্বশেষ বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার গণ্ডগ্রামের হিন্দুপাড়া থেকে পাখিটির বেশকিছু ভালো ছবি তুললাম।

কালেঙ্গায় দেখা দৈত্যকায় পাখিগুলো এ দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি ভুতুম প্যাঁচা। হুতুম প্যাঁচা, কুদুম প্যাঁচা বা মেছো প্যাঁচা নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম ব্রাউন ফিশ-আউল। বৈজ্ঞানিক নাম Ketupa zeylonensis। ভুতুম প্যাঁচা তুরস্ক থেকে সিরিয়া হয়ে ইসরায়েল, দক্ষিণ চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশের (ভুটান ও মালদ্বীপ বাদে) প্রায় সব দেশেই বাস করে।

প্রাপ্তবয়স্ক ভুতুম প্যাঁচার দেহের দৈর্ঘ্য ৪৮-৬১ সে.মি., প্রসারিত ডানা ১২৫-১৪০ সে.মি. ও ওজন ১.১-২.৫ কেজি। মাথা বড়সড় ও গোলাকার। চোখ বড় বড়। মাথার দু'পাশে কানের মতো পালকগুচ্ছ রয়েছে। হালকা হলুদ ছিটাসহ পিঠের পালক ঘন বাদামি। বুক ও পেট আরও হালকা, তাতে রয়েছে গাঢ় ছিটছোপ। মাথার চাঁদি, কাঁধ-ঢাকনি ও ডানা-ঢাকনিতে অতি সরু কালচে-বাদামি দাগ রয়েছে। ডানায় রয়েছে বাদামি ডোরা। চোখ হলুদ ও চঞ্চু ধূসর। পা ও পায়ের পাতা কালচে-হলুদ। প্যাঁচা-পেঁচি দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক প্যাঁচার লালচে-বাদামি পিঠে সরু দাগছোপ, দেহতলে অনুজ্জ্বল ও ফ্যাকাশে দাগ এবং গলায় রয়েছে সাদা পট্টি।

ভুতুম প্যাঁচা পুরো দেশের বিভিন্ন ধরনের পরিবেশে, যেমন- মিশ্র চিরসবুজ বন, গাছপালাসম্পন্ন এলাকা, পুরোনো আমবাগান, গাছে ঢাকা নদীর পাড়, গ্রামীণ জলাভূমির পাড়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করে। দিনে গাছের ঘন পাতার আড়ালে, ঝাঁশঝাড় ও গাছের খোঁদলে বিশ্রাম নেয়। রাতের শিকারি হলেও ভোর ও গোধূলিতেও তৎপর থাকে। পানির ধারে শিকারের খোঁজে বসে থাকে ও পায়ের নখ দিয়ে মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, ইঁদুর, সরীসৃপ, পাখি ইত্যাদি শিকার করে খায়। গভীরভাবে 'হুপ-হুপ-হু...' শব্দে ডাকে।

নভেম্বর থেকে মার্চ প্রজননকাল। এ সময় পানির ধারে বড় গাছের কোটর বা খোঁদলে অথবা পুরোনো আম বা বটগাছের ডালে বাসা বানায়। অনেক সময় চিল বা ইগলের পরিত্যক্ত বাসাও ব্যবহার করতে পারে। ডিম পাড়ে এক-দুটি, রং ঘিয়ে সাদা। পেঁচি একাই ডিমে তা দেয়। ডিমে তা দানরত পেঁচিকে প্যাঁচা খাবার খাওয়ায়। ডিম ফোটে ৩৪-৩৮ দিনে। প্যাঁচা-পেঁচি মিলেমিশে ছানাদের লালনপালন করে। ছানারা প্রায় ৫০ দিনে উড়তে শেখে। আয়ুস্কাল ৫-৬ বছর।

লেখক :অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর


মন্তব্য করুন