মধুপুরের রত্নখচিত বনপ্রান্তরে অনেক ঘুরে বেড়িয়েছি। টেলকি, আউশনারা, দোখলা- কত অরণ্যপথ পাড়ি দিয়েছি! তবে এবারের কভিড পরিস্থিতিতে গিয়েছিলাম খুবই সীমিত সময়ের জন্য। দোখলায় বঙ্গবন্ধুর লাগানো গাছগুলো দেখতে গিয়েছিলাম এ বছরের মার্চ মাসে। মধুপুর থেকে সঙ্গী হলেন টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টারের তরুণ উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. মাজেদুল ইসলাম। ফিরতি পথে তার আমন্ত্রণে মাতৃবাগানটি দেখতে গেলাম। ঢোকার পথেই সুসজ্জিত উদ্ভিদের সারি এবং উপস্থাপনার কৌশল নজর কাড়ল। চারপাশে চোখ বুলিয়ে মনে হলো বেশ যত্নেই আছে মাতৃগাছ এবং তাদের শিশুরা। অফিস প্রাঙ্গণের চটকদারি মৌসুমি ফুলের নান্দনিক বিন্যাস দেখে মনে হলো প্রতিষ্ঠানটি শুধু বাণিজ্যিকই নয়, দর্শনার্থী বান্ধবও। মাজেদুল ইসলাম দেখালেন, একটি ছোট গাছে আমের চারটি রকমফের। কাছেই জাবাটিকাবার গাছ। কাণ্ড এবং ডালপালায় অজস্র ফল ঝুলছে। কালচে রঙের পরিপকস্ফ ফল খেয়ে দেখা গেল, স্বাদ ভালো। অনেকটা লুকলুকি বা পায়লাগোটার মতো। এই ফলগাছ দেশে খুব একটা নেই। বর্তমানে এই কেন্দ্র থেকে ৮৮ প্রজাতির উদ্ভিদ ও সবজির চারা-কলম নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিক সাফল্যের হাত ধরে ২০১৮ সালের উন্নয়ন মেলায় অর্জন করেছে দ্বিতীয় স্থান।

একটি ছোট্ট মফস্বল শহরের এই উদ্যানকেন্দ্রটির রয়েছে কিছু ব্যতিক্রম সাফল্য। গত দুই বছরে কেন্দ্রটির অর্জন- কাজুবাদাম ও রাম্বুটানের চারা উৎপাদন, অ্যাভোক্যাডো গ্রাফটিং, কাঁঠাল গ্রাফটিং, মাল্টা গ্রাফটিং, আমড়া গ্রাফটিং, চালতা গ্রাফটিং, আমলকী গ্রাফটিং এবং বেল গ্রাফটিং পদ্ধতির সফল উৎপাদন। এই পদ্ধতিতে উৎপাদন অনেকগুণ বেড়েছে। ইতোমধ্যেই কাজুবাদামের ৪০০ চারা, অ্যাভোক্যাডোর ৫০টি কলম ও রাম্বুটানের ৭০টি চারা তৈরি করেছে কেন্দ্রটি।

প্রতিষ্ঠানটির সেবা ও প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে- আধুনিক ও উন্নতমানের চারাকলম উৎপাদন প্রযুক্তি, ছাদবাগান স্থাপনায় উৎপাদন প্রযুক্তি, পলিশেড বা নেট হাউস উৎপাদন প্রযুক্তি, টপওয়ার্ক ও মাতৃবাগান ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি, নিরাপদ ফল ও সবজি উৎপাদন প্রযুক্তি, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রযুক্তি ইত্যাদি। বর্তমানে এই কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পরিচালিত 'বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প'র অধীনে কাজুবাদাম ও কফির প্রদর্শনী তৈরি ও বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

সার্বিকভাবে আঞ্চলিক উদ্যানধারা ও কৃষি ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে শতোর্ধ্ববর্ষী এই কৃষিজ প্রতিষ্ঠানটি। সেখানকার আঞ্চলিক কৃষি ও ফল উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে। উল্লেখযোগ্য হলো- উত্তর টাঙ্গাইলে আধুনিক ও উন্নত জাতের ফুল, ফল, সবজি ও ঔষধি ফসলের মানসম্মত চারা-কলম সহজলভ্যতা। আধুনিক ও উন্নত জাতের ফল, ফুল, সবজি ও ঔষধি জাতীয় ফসলের সম্প্রসারিত এলাকা বৃদ্ধি। আধুনিক উদ্যানবিষয়ক কৃষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কারিগরি জ্ঞান সম্প্রসারণ। ছাদবাগান স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক পরামর্শ প্রদান। পতিত ও ঢালু জমিতে কফি ও কাজুবাদামের চাষ সম্প্রসারণ। চাহিদা ভিত্তিক ফল, ফুল, সবজি ও ঔষধি ফসলের কৃষক নার্সারি গড়ে তোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। উদ্যান ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি ও টেকসই উদ্যান ফসল বিন্যাস কার্যক্রম।

মাতৃবাগানটির প্রধান কর্মকর্তা উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. মাজেদুল ইসলাম মনে করেন কৃষি প্রযুক্তির আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই কেন্দ্রটি আরও অধিক ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো (উন্নত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, অত্যাধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব, গ্রিনহাউস, উন্নত সেচ প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন) গড়ে তোলা প্রয়োজন।

হর্টিকালচার সেন্টার সূত্র থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ সরকার ১৯১৮ সালে ধনবাড়ীতে মহকুমা স্থাপনের লক্ষ্যে ৬০.০৬ একর জমি খাস করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেখানে মহকুমা না হওয়ায় ধনবাড়ীর জমিদার, অবিভক্ত বাংলার কৃষিমন্ত্রী নবাব বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরী ওই ৬০.০৬ একর জমির মধ্যে ৫.৯৯ একর জমিতে কৃষি ফার্ম নামে একটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। ওই কৃষি ফার্মটিই পরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধনবাড়ী হর্টিকালচার নামে প্রতিষ্ঠা পায়।

মন্তব্য করুন