বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর রাজধানীর শাহবাগে চারতলা ভবনে পরিচালিত হচ্ছে বহুদিন ধরে। এর ৪৫টি গ্যালারিতে ২০ হাজার বর্গমিটারজুড়ে প্রদর্শন করা হয় প্রায় পাঁচ হাজার নিদর্শন। জাদুঘর কর্তৃপক্ষের হাতে ৯৩ হাজারের বেশি সংখ্যক নিদর্শন থাকলেও জায়গার অভাবে তা প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। কয়েক বছর পরপর অল্প কিছু নিদর্শন অদল-বদল করে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হলেও বেশিরভাগই উন্মুক্ত করা হচ্ছে না জনসাধারণের জন্য। তবে নতুন ভবন তৈরি হলে সংকট কিছুটা কাটবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

রেজিস্ট্রেশন কর্মকর্তা শহীদুর রহমান খান বলেন, এ বছর মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে ৯৩ হাজার ৩৬৮টি নিদর্শন। গত এক বছরে নতুন করে ৫৩টি নিদর্শন যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি চারটি শাখা জাদুঘরে চার হাজার ৯৬৪টি নিদর্শন রয়েছে। তবে এগুলো ছাড়াও বেশ কিছু নিদর্শন আছে যেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এগুলো মডেল নিদর্শন বা দ্বিতীয় শ্রেণির নিদর্শন। সব মিলিয়ে জাদুঘরের নিদর্শন সংখ্যা লাখ ছাড়াবে। জাদুঘরের মহাপরিচালক খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের গ্যালারিগুলো সব নিদর্শন প্রদর্শনী করার মতো পর্যাপ্ত নয়। ১৩ তলাবিশিষ্ট নতুন একটি ভবন তৈরির প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে অফিস ও গুদামগুলো নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হবে। এতে এই ভবনের অনেক জায়গা ফাঁকা হয়ে যাবে। সেখানে নতুন গ্যালারি বানিয়ে অনেক নিদর্শন প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।

আছে প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে বর্তমান ইতিহাস :জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের কিপার নূরে নাসরিন জানান, প্রাগৈতিহাসিক যুগের 'ফসিল উড' সংরক্ষণ করা আছে এখানে। এর প্রাপ্তিস্থান নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এটিকেই সর্বপ্রাচীন নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া মানুষ যখন শিকার করে খাওয়া শুরু করে, সেই সময়কার 'প্রস্তর কুঠার' আছে এখানে। এটা তৎকালীন নোয়াখালী (বর্তমান ফেনী) জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলায় পাওয়া গিয়েছিল।

ইতিহাস বিভাগ জানায়, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ময়নামতি, সাভার, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলের 'পোড়ামাটির টেরাকোটা' সংরক্ষিত আছে জাদুঘরে। পাহাড়পুরের টেরাকোটাগুলো ৭ম-৮ম শতকের দিকের রাজা ধর্মপালের সময়ের।

সংরক্ষিত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো যক্ষ ও যক্ষীর দুটি ভাস্কর্য মৌর্য যুগের (৩২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৮৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)। তবে এ দুটির মধ্যে যক্ষের ভাস্কর্যটি বেশি পুরোনো। জাদুঘরে ধাতব, কালোপাথর ও বেলেপাথরের ভাস্কর্য সংগ্রহ করা আছে। কালোপাথরের ভাস্কর্যগুলো ভারতীয় উপমহাদেশের ভাস্কর্যের অন্যতম সংগ্রহ। এ ছাড়া সংগ্রহশালার কিছু ভাস্কর্য বিশ্বের একমাত্র নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত আছে। পাশাপাশি গুপ্ত যুগ থেকে শুরু করে ১৯ শতকের বিভিন্ন সময়ের মুদ্রাও আছে সংরক্ষণে। এসব ছাড়াও দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উপাদান, প্রত্ননিদর্শন, শিলালিপি, তুলোট কাগজ ও তালপাতায় লেখা পা ুলিপি, মধ্যযুগীয় অস্ত্রশস্ত্র, কারুশিল্পপ্প, নকশিকাঁথা, গাছপালা, পশুপাখি প্রভৃতি নিদর্শন রাখা হয়েছে জাদুঘরে।

খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'সিরাজউদ্দৌলার পলাশীর প্রান্তরের যুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কালের প্রচুর নিদর্শন আমাদের এখানে সাজানো আছে, যা অন্য কোনো জাদুঘরে পাওয়া যাবে না। এটি আমাদের দেশের জাতীয় জাদুঘরের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।'

আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস আজ :১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জাদুঘর পরিষদ (ওঈঙগ) ১৯৭৭ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রতি বছর ১৮ মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই থেকে বিশ্বের জাদুঘরগুলোতে দিবসটি পালন করা হয়। ২০১৩ সালে রেকর্ডসংখ্যক ১৪৩টি দেশের ৩৫ হাজার জাদুঘরে দিবসটি পালিত হয়েছে। এ বছর সংখ্যাটি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন