নবাবগঞ্জের মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ফুলবাড়িয়া থেকে নবাবগঞ্জ রুটে অত্যাধুনিক গাড়ি নামালেও দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন সড়ক পরিবহন খাতের একমাত্র নারী উদ্যোক্তা নারগিস মল্লিক। তিনি 'এন মল্লিক' সার্ভিসের কর্ণধার। ঢাকা-নবাবগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে দীর্ঘদিন ধরে গণপরিবহনে নৈরাজ্যের শিকার তিনি। গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া থেকে নবাবগঞ্জ রুটে ৯টি বাসস্ট্যান্ডে ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় ব্যক্তির চাঁদাবাজি তার নিত্যদিনের দুর্ভোগ। এ ছাড়াও এন মল্লিকের যাত্রীবাহী বাসের ড্রাইভার ও হেলপারদের মারধর করাসহ গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করছে অন্য কোম্পানির গাড়ি। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারছে না বাসে যাতায়াতকারী জনসাধারণও। এর মধ্যেও করোনাকালে লকডাউনের প্রভাবে সৃষ্ট সংকটকে হার মানিয়েছে সম্প্রতি নবাবগঞ্জের বান্দুরা বাজার বাসস্ট্যান্ডে তার ৯টি গাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনা। দুর্বৃত্তদের ধরিয়ে দেওয়া এ আগুনেই নারগিসের লালিত স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

জানা যায়, এন মল্লিকের আওতাধীন মোট ৪৬টি গাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি রয়েছে ১০টি। প্রতিটি গাড়ি তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ লাখ টাকা করে। এ ছাড়া নন এসি প্রতিটি গাড়ি তৈরিতে খরচ হয়েছে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে। স্বামীর মৃত্যুর পর ২০০৯ সালে তার দেওয়া জমি ও নিজের স্বর্ণালঙ্কার বিক্রির অর্থ ও ব্যাংক থেকে ঋণের টাকা দিয়ে ১০টি নন এসি গাড়ি নামান রুটে। এরপর ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি ইফাদ গ্রুপের মাধ্যমে আবারও ঋণ করে অন্য ৩৫টি গাড়ি তৈরি করেন। প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকারও বেশি কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে নারগিস মল্লিককে। গত মাসের ২৮ তারিখে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে এই পরিবহন প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া এন মল্লিকের পরিবহন সেবা পরিচালনায় মোট ৩০০ জন কর্মী রয়েছেন। যাদের মধ্যে একটা অংশ কর্মস্থান হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল নবাবগঞ্জের বান্দুরা বাজার বাসস্ট্যান্ডে এ অগ্নিকাে র ঘটনা ঘটে। ওই দিন বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। নারগিস মল্লিক এই প্রতিবেদককে বলেন, '২০০৯ সালের শুরুর দিকে ব্যবহূত প্রাইভেট গাড়িটি মেরামতের কাজে ওয়ার্কশপে দেওয়ায় বাসে চড়েই গ্রামের বাড়ি নবাবগঞ্জে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়িতে উঠতে পারছিলাম না। সেই সময় মোমিন কোম্পানির একটা গাড়িতে ওঠার সুযোগ পাই। কিন্তু গাড়িতে দাঁড়ানোর কোনো অবস্থা ছিল না। গাড়ির ছাদেও ছিল ১৫ থেকে ২০ জন যাত্রী। এ অবস্থায় মানুষের ভোগান্তির বিষয়ে চালককে জিজ্ঞাসা করলে ডাকেশ্বরের চর এলাকায় গাড়ির হেলপার বলে ওঠে, 'চুপ থাকেন, বেশি কথা বললে ঘাড়ে ধরে চকের মধ্যে নামাইয়া দিয়া যাইব।' এই একটা কথার জেরেই মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ওই বছরের মাঝামাঝি সময়ে পরিবহন খাতে কাজ করার উদ্যোগ নেই। ঋণ করে ১০টি গাড়ি নামাই। অথচ দিনের পর দিন নৈরাজ্যের শিকার হয়েছি। বিশেষ করে নবাবগঞ্জের বান্দুরায় প্রতি মাসেই চাঁদা দিয়ে চলতে হয়। তাও লাখ টাকার নিচে নয়। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি মূল্যের ৯টি গাড়ি পুড়িয়ে দিল।' তিনি জানান, প্রতি মাসে যারা চাঁদা নিত। তারাই এই অগ্নিকাে র ঘটনা ঘটিয়েছে। জালাল, আমিনুর রহমান রশিদ, আমির হোসের কুটি, জালাল উদ্দিন এরাই মূল হোতা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিকাে র ঘটনায় সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) অরুন কৃষ্ণ পালকে সভাপতি করে এ কমিটি গঠন করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, বান্দুরা বাসস্ট্যান্ড টার্মিনালের 'টোল নেওয়া'কে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া এ রুটে করোনাকালীন লকডাউনে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে নবাবগঞ্জে বিআরটিসির ১০টি গাড়ি চলাচল শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, এন মল্লিক আর বিআরটিসির দ্বন্দ্বে এ ঘটনা ঘটিয়েছে কতিপয় ক্ষমতাসীন দলের ব্যক্তি।

প্রতিবন্ধী নারীকে ছুড়ে ফেলার দৃশ্যও সাজানো

চলতি বছরের ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর বাজার এলাকায় ভাড়া দিতে না পারায় এন মল্লিক পরিবহনের এক বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে বাকপ্রতিবন্ধী নারী যাত্রীকে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনা প্রসঙ্গে নারগিস মল্লিক বলেন, 'এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে পরিকল্পিত। কারণ মূল ঘটনার আগে থেকেই বাইকে চড়ে এক যুবক শুধু ওই বাসের ভিডিও করছিল। ওই নারীকে ফেলে দেওয়া পর্যন্ত ধারণ করে সঙ্গে সঙ্গে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অথচ এন মল্লিক পরিবহনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে থেকে কোনো ভাড়া নেওয়া হয় না। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনকে ওই নারী তাকে বাস থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার কারণও লিখে জানিয়েছেন।' টাইলসের ওপর তার সেসব লেখার একটি স্থিরচিত্র সমকাল সংগ্রহ করেছে। সেখানে ওই নারী লিখেছেন, 'এন মল্লিক কোনাখোলা থেকে উঠাইসে। ভাড়া নাই। এন মল্লিক কোনো দিনও আমার থেকে ভাড়া নেয় না। এরা ভাড়া চায়। দিতে না পারায় এমুন ব্যবহার। এন মল্লিকের সবাই আমাকে চেনে। ও মনে হয় চিনে নাই। তাই বুজাবার চেষ্টা করসিলাম।'

ফেসবুকে বিভিন্ন সময়ে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট

সম্প্রতি এন মল্লিক পরিবহনে জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো বলে ফেসবুক পেজে স্লোগান দেওয়া হয়। মিছিলের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ বিষয়ে নারগিস মল্লিক ওয়ারী থানায় জিডি করেন। জিডিতে বলা হয়, সম্প্রতি একটি মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে এন মল্লিক পরিবহনের সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করছে। যার অংশ হিসেবে 'আরিয়ান আহমেদ মিরাজ' নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী তার প্রোফাইল থেকে প্রচার করে 'আবারও একটি বাচ্চাকে মেরে ফেলল এন মল্লিক পরিবহন।' সেই পোস্টে এন মল্লিক পরিবহনের একটি গাড়ির (১৫২১ নং) ছবিও ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া 'ঢাকা-নবাবগঞ্জের আলো' নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকেও একই রকমের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করা হয়। সেখানে কমেন্টে 'সেলিম বিডি' নামের একজন লেখেন 'জ্বালো জ্বালো, এন মল্লিকে আগুন জ্বালো। এন মল্লিকের যত বাস আছে সবগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিন।'

নারগিস মল্লিক বলেন, পরিবহন সেক্টরে 'নারী' হওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছি। অন্য কেউ হলে এ খাতে বেশিদিন টিকতে পারবে না। কিন্তু হাজার বাধা সত্ত্বেও আমি পিছপা হয়নি। সাহস নিয়ে এগিয়ে চলেছি। আমার বিশ্বাস 'আল্লাহ' এদের শাস্তি দেবে। যাত্রীরা আমার পক্ষে আছে। এলাকার মানুষ পক্ষে আছে।'


মন্তব্য করুন