ঘুমের মধ্যেই ঘুমের দেশে চলে গেলেন বরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাহিত্যিক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতীয় সময় ভোর ৬টায় দক্ষিণ কলকাতায় নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।

দীর্ঘদিন ধরে কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। তার ডায়ালাইসিস চলছিল। বৃহস্পতিবারও ডায়ালাইসিস হওয়ার কথা ছিল। তার আগেই বুধবার রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। গতকাল ভোরে তার স্ত্রী সোহিনী দাশগুপ্ত দেখেন, বুদ্ধদেবের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে। ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় চিকিৎসককে ডেকে পাঠানো হয়। তিনি এসে পরীক্ষা করে জানান, ঘুমের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটেছে।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত কেবল পরিচালনা নয়, সাহিত্য জগতেও সমানভাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তার মৃত্যুতে সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। টুইট করে শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কলকাতার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টুইটে নরেন্দ্র মোদি লেখেন, 'বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মৃত্যুতে আমি শোকাহত। তার বৈচিত্র্যময় কাজের সঙ্গে সমাজের সব অংশের নাড়ির যোগ ছিল।' মমতাও তার টুইটার বার্তায় বিভিন্ন প্রাপ্তির দিক তুলে ধরেন।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের জন্ম ১৯৪৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পুরুলিয়ার আনাড়ায়। বাবা তারাকান্ত দাশগুপ্ত ছিলেন রেলের চিকিৎসক। ৯ ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। মাত্র ১২ বছর বয়সে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। ভর্তি হন হাওড়ার দীনবন্ধু স্কুলে। অর্থনীতি নিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন শ্যামসুন্দর কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তার অনুরাগ ছিল চলচ্চিত্রের প্রতি। সেই অনুরাগ থেকেই কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির সদস্য হন এক সময়। ১৯৬৮ সালে ১০ মিনিটের তথ্যচিত্র 'দ্য কন্টিনেন্ট অব লাভ' দিয়ে চলচ্চিত্রে ক্যারিয়ারের শুরু বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের। তার পরিচালিত উল্লেখযোগ্য সিনেমা হলো 'দূরত্ব', 'বাঘ বাহাদুর', 'চরাচর', 'লাল দরজা', 'নিম অন্নপূর্ণা', 'গৃহযুদ্ধ', 'মন্দ মেয়ের উপাখ্যান', 'স্বপ্নের দিন' ও 'উড়োজাহাজ'। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তার লেখা 'কফিন কিংবা সুটকেস', 'হিমযোগ', 'রোবটের গান', 'শ্রেষ্ঠ কবিতা'সহ বহু কবিতা পাঠকের মনে এখনও অনুরণন তুলে যাচ্ছে।

অনবদ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে একাধিকবার জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন বুদ্ধদেব গুহ। এ ছাড়া পেয়েছেন আজীবন সম্মাননা, স্বর্ণপদক, স্বর্ণভাল্লুকসহ দেশ ও দেশের বাইরে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের আকস্মিক বিদায়ে শোকাহত তরুণ মজুমদার বলেন, 'হঠাৎ খবরটা শুনে শকড হয়ে পড়েছি। এখন আর কিছু বলতে পারছি না।'

অপর্ণা সেন বলেন, 'আমি যত পরিচালক দেখেছি, তার মধ্যে তিনি সবচেয়ে অন্যরকম। তার ছবি আমার কাছে কবিতার মতো লাগত।' পরিচালক গৌতম ঘোষ বলেন, 'আমরা একসঙ্গে কাজ শুরু করেছিলাম। আমাকে জোর করে অভিনয় করিয়েছিলেন। অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে আজ। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।' অভিনেতা প্রসেনজিৎ লিখেছেন, 'ছোটবেলা থেকে বুদ্ধ'দার ছবি দেখছি। তার দেশের, তার ভাষার মানুষ হিসেবে গর্ববোধ করি। শিক্ষক মানুষ ছিলেন বুদ্ধদা। কবিও ছিলেন। সব থেকে উল্লেখযোগ্য, তার মতো ভালো মানুষ আমি কম দেখেছি।'

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের প্রয়াণে ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনেও নেমে এসেছেন শোকের ছায়া। বরেণ্য এই নির্মাতার স্মরণে অভিনেতা ও নির্মতা মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা বলেন, '?পরিচালক এবং সাহিত্যিক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্য জগতে এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান হলো।'

নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, 'একজন মাস্টার চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তিনি আমাদের প্রজন্মকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছেন। তার কাজ আমাদের সারাজীবনের অনুপ্রেরণা। তার মৃত্যুতে চলচ্চিত্র জগতের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। আমি তার পরিবার-পরিজন ও অনুরাগীদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।'

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের পরিচালনায় নব্বইয়ের দশকে 'লাল দরজা' চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিনেত্রী গুলশান আরা আক্তার চম্পা। তিনি বলেন, '?দুই দিন আগেও বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা আর হলো না। তিনি এভাবে চলে যাবেন- তা কল্পনাও করতে পারিনি। তিনি আমাকে দিদি বলে ডাকতেন। ছোট বোনের মতো আদর করতেন, ভালোবাসতেন। লাল দরজা করতে গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।'

নির্মাতা আকরাম খান বলেন, 'গত ২৫ থেকে ৩০ বছরে পশ্চিমবঙ্গে একমাত্র বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে দেখেছি তার চলচ্চিত্রের বিশ্বাস আর আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হতে। নিজের বিশ্বাসের স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র নির্মাণ অব্যাহত রেখেছিলেন তিনি। বিদায় পথপ্রদর্শক!

মন্তব্য করুন