সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামের আব্দুল জলিল এবার সাড়ে তিন একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। দুর্যোগ-দুর্বিপাক ছাড়াই সময়মতো ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন তিনি। আবাদ, কাটা-মাড়াইয়ে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে পেয়েছেন ৬০ হাজার টাকার ধান। এ টাকা দিয়ে পুরো বছর সংসার চালানো নিয়ে হতাশা ভর করেছে জলিলের মনে। বাকি সময় হাওরের মাছ ধরেই বাঁচতে চান তিনি। তবে এই বাঁচার চিন্তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন চিন্তা- হাওরে মাছ ধরা যাবে তো? হাওরে কেন মাছ ধরা যাবে না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লিজ নিয়ে বড় লোকেরা জেলেদের ভাসান পানিতে নামতে দেয় না। ইজারাদারের লোকজন হাওরে বন্দুক নিয়া পাহারায় নেমেছে।

হাওরের কৃষকরা বলছেন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাঁধ নিয়ে অনিয়ম, যথাসময়ে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ না হওয়া, জলমহাল ইজারায় দুর্নীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভাসান পানিতেও মাছ ধরতে না দেওয়া এবং দুর্বল বিপণন ব্যবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। অব্যবস্থাপনার কারণে ঠকছেন।

কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, হাওরে এবার বোরো আবাদ হয়েছে চার লাখ ৫১ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে, যা মোট আবাদের প্রায় ৯.২৫ শতাংশ। এ মৌসুমে সরকার ধানের দাম প্রতি মণ এক হাজার ৮০ টাকা নির্ধারণ করে। কৃষকরা বলছেন, এক মণ ধান উৎপাদনে প্রায় সাড়ে ৯০০ টাকা খরচ হয়। নিজের শ্রম যুক্ত করলে দাম আরও বাড়ার কথা। কৃষকরা ধান সরকারিভাবে বিক্রি করতে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়েন। ধানের আর্দ্রতা বেশি বলে অনেক সময় কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। লটারিতেও প্রভাবশালীরা প্রভাব খাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

জেলা কৃষক সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, সময়মতো সরকার ধান না কেনায় সুযোগ নেয় মিল মালিক-ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা। মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ শোধ করতে কৃষক কম দামে বিক্রি করে সোনালি ধান।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব মতে, দেশে হাওরের সংখ্যা ৪২৩টি। হাওরের প্রধান সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থা। বর্ষায় নৌকা ও ট্রলার ছাড়া যোগাযোগের কোনো মাধ্যম থাকে না। শুস্ক মৌসুমে হেঁটে যাতায়াত করতে হয়। হাওরের গ্রামগুলো জেলা কিংবা উপজেলা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় কৃষকরা ধান বিক্রি করতে সমস্যায় পড়েন। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় যন্ত্রের সুবিধা কৃষকরা ভোগ করতে পারেন না।

২০১৭ সালে অকাল বন্যার পর ঠিকাদারি প্রথা বাতিল হয়ে এখন সব হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে। কিন্তু এখনও বাঁধের কাজ সময়মতো শুরু হয় না, সময়মতো শেষ হয় না। আবার অপ্রয়োজনীয় জায়গায় বাঁধ নির্মাণেরও ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরে সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার হাওরে ৮১৭টি প্রকল্পে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ হয়। এ জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৩৪ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এবার কাজ শেষ হয়নি। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সুরমা ভেলি পার্কের বুকে ফসলরক্ষা প্রকল্পের বাঁধের টাকায় সড়ক নির্মাণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে পাউবো এটিকে বাঁধ বললেও স্থানীয়রা বলছেন, এটি অপ্রয়োজনীয়। কারণ, এখানে কৃষি জমি থাকলেও বোরো ধান চাষ হয় না। এ ছাড়া দক্ষিণ সুনামগঞ্জের লাউয়ার খালের দক্ষিণ পাড়ের বাঁধটি অক্ষত থাকার পরও নেওয়া হয়েছে নতুন প্রকল্প।

নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে জেলা ও উপজেলা বাঁধ মনিটরিং কমিটি। কিন্তু সেখানে স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা সমকালকে বলেন, বাঁধ নির্মাণে জড়িতদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে তাদের ওপর সামাজিকভাবে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। এ জন্য জনগণ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মীর সমন্বয়ে সামাজিক বাঁধ মনিটরিং কমিটি গঠন করলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। কৃষকদের অধিকার সচেতন করা গেলে তারা নিজেরাই নিজেদের অধিকার আদায় করে নেবেন।

কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সার-বীজসহ উপকরণের দাম কমানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, হাওর অঞ্চলে আরও অধিক পরিমাণে সাইলো বা খাদ্যগুদাম নির্মাণ করতে হবে। হাওরের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন ছাড়া এসডিজি গোল অর্জন সম্ভব নয়। প্রকৃত জেলেদের জলমহাল ইজারা দেওয়া, ইজারা মূল্য কমানো, মৎস্যজীবীদের বিনা সুদে ঋণ দেওয়া এবং হাওরে মৎস্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলার সুপারিশ করেন কাসমির রেজা।

হার না মানা হাওরবাসী :অক্সফ্যাম সারাদেশে 'রিকল' নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় অক্সফ্যাম ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) 'গণতান্ত্রিক সুশাসনে জনসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ' শিরোনামে একটি সামাজিক নিরীক্ষা পরিচালিত করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় মানুষকে সংগঠিত করে সরকারের সেবা পাওয়াসহ নানা বিষয়ে উৎসাহ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যার সুফলও মিলছে।

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ছাতিরচর ইউনিয়নে ১৭ হাজার মানুষের বসবাস। এখানে নদীভাঙনের শিকার মানুষ ছাতিরচর ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামে স্থাপনা তৈরি করে বসবাস করছে। কিন্তু যাতায়াতের রাস্তা না থাকায় অনেকদূর ঘুরে বাজারে যেতে হতো। অক্সফ্যামের সহায়তায় এ ইউনিয়নে গঠিত সিবিও এলায়েন্সের সদস্য লাটমিয়া, নুরুল আমিন, হিমেল খান ও ছালমা বেগম রাস্তা নির্মাণ নিয়ে এলাকার লোকজনের সঙ্গে সভা করেন। পরবর্তী সময়ে প্রায় ৪৫টি পরিবার এক লাখ ৩০ হাজার টাকা তুলে পাকা ঘাট নির্মাণ করে।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের সুলেমানপুরে অক্সফ্যামের প্রকল্পের মাধ্যমে স্যানক্রেড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন 'উত্তর পাড়া সলেমানপুর তৃণমূল সংগঠন' গঠন করে। এসডিজি বাস্তবায়নে এই সংগঠনকে শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা, জেন্ডার সমতা আনয়ন ও অসমতা হ্রাস, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ চলছে। এতে মানুষ ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছে। ১৩টি বাল্যবিয়ে বন্ধ, ১৬টি দাম্পত্য কলহ সমাধান, শিশুশ্রম বন্ধের মাধ্যমে ২৩ শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করা, ৩১ জনকে বয়স্ক ভাতা পাইয়ে দেওয়া, ১৮ কৃষককে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা, কৃষি পরামর্শ সেবা পাওয়া, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত, কাঁচা রাস্তা পাকা করা, করোনাকালে শিশুদের পড়াশোনা সচল রাখাসহ নানা উন্নয়ন কাজ হচ্ছে।

বিষয় : হাওরের কৃষক

মন্তব্য করুন