কাউফল মানে শৈশবের একমুঠো আনন্দময় স্মৃতি। অপেক্ষায় থাকতাম কখন বর্ষা নামবে প্রকৃতিজুড়ে। টসটসে জামরুলগুলো জলকণা জড়িয়ে অপেক্ষা করবে আমাদের জন্য। আর কাউফলগুলো লোভনীয় রং মেখে ডাকবে আমাদের। তারপর একদিন হারিয়ে ফেলেছি ছেলেবেলায় মনের গহনে যতন করে রাখা সেই ফলগুলো। লোকালয়ের গ্রামীণ বন অনেক আগেই নিঃশেষ। ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে ঠেকেছে প্রাকৃতিক বনও। বন না থাকলে বুনোফল থাকবে কোথায়! অথচ এক সময় আমাদের বনবাদাড়ে কাউফল অঢেল ছিল। লন্ডনের কিউ বোটানিক গার্ডেনের কর্মী ও ব্রিটিশ ভারতের অরণ্যতরু সন্ধানী জে ডি হুকার প্রায় দেড়শ বছর আগে সিলেটের খাসিয়া পাহাড়ে কাউফল খুঁজে পেয়েছিলেন। দ্য হিমালয়ান জার্নাল-এ তিনি এসব বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন। হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ড্যালটন হুকার নামে গ্রন্থটির অনুবাদ ও সরলীকরণ করেছেন নিসর্গবিদ অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা। সেখান থেকে উদ্ধৃতি- "... সুপারি চাষ ব্যাপক, গাছগুলো যেন 'আকাশ থেকে ছুড়ে দেওয়া ঈশ্বরের তির'। ওক, গাব, কাউ, ডুমুর, কমলা, কলা ও কেয়া সর্বত্র। ... বাড়িটি ১৫০ ফিট উঁচু এক টিলার মাথায়, চারদিকে অনেক গাছপালা- ওক, গাব, কাউ, মাকড়িশাল আর গোটা টিলা ছেয়ে আছে দাঁতরাঙার হালকা বেগুনি ফুলে।"

নিশ্চিত করে বলা যায়, আমাদের বিপন্ন বুনোফলের তালিকায় কাউফল বেশ শক্তপোক্ত অবস্থানে রয়েছে। নগর উদ্যানে তো বটেই দারুমূল্যহীন হওয়ায় গ্রামেও অনাদৃত। ফলে অধিকাংশ গ্রামই এখন কাউফলশূন্য। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, পার্বত্যাঞ্চল ও উপকূলীয় জেলাগুলোয় অল্পকিছু গাছ চোখে পড়ে। প্রাক-বর্ষায় ফলটি স্বল্প সময়ের জন্য বাজারে এলে মনে হয়, এখনও একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তবে আর কতদিন দেখতে পাব তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

কাউফল (Garcinia cowa) অঞ্চলভেদে কাউগোলা বা কাউয়া নামেও পরিচিত। মাঝারি আকৃতির চিরসবুজ সুশ্রী গাছ। শাখা ঝুলন্ত, নিচের ডালগুলো ভূমিস্পর্শী। পাতা ৭ থেকে ১২ সেমি চ্যাপ্টা, লম্বাটে, চার্ম, নিচটা ঝলমলে সবুজ, ওপর সামান্য লালচে, আগা চোখা। নিশ্ছিদ্র পাতার বুননে বেশ আকর্ষণীয়। ঝুলন্ত ডালপালায় ফুল আসে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে। একই গাছে দুই ধরনের ফুল (স্ত্রী ও পুং) ফোটে। ফুলগুলো লালচে হলুদ, দেড় সেমি চওড়া, ৩ থেকে ৮টি পুং ফুল গুচ্ছবদ্ধ, পুংকেশর অজস্র, পরাগ ৪ কোষী। স্ত্রী ফুল আকারে পুং ফুল অপেক্ষা বড়, মঞ্জরিতে সংখ্যায়ও কম। ফল পাকে জুন-জুলাই মাসে। ফল গোলাকার, ঈষৎ খাঁজযুক্ত। কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে হলুদাভ। বীজযুক্ত শাঁস কমলা-হলুদ রঙের, রসাল ও মুখরোচক। শিশুদের প্রিয়। ফলে শতকরা প্রায় ২.৩ ভাগ ও খোসায় ১২.৭ ভাগ হাইড্রোক্সিসাইট্রিক অ্যাসিড আছে। অনেকেই নুন-মরিচ মাখিয়ে খেতে পছন্দ করেন। ফল জ্যাম-জেলি করে সংরক্ষণ করা যায়। শুকনো ফল ও কচিপাতা নানা কাজে ব্যবহার্য। আশা করি, সরকারের কৃষি বিভাগ উদ্যোগী হয়ে কাউফলকে নিশ্চিত বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করবে।

বিষয় : প্রকৃতি বিপন্ন কাউফল

মন্তব্য করুন