করোনা মহামারির মধ্যেই সিনিয়র স্কেলে পদোন্নতির পরীক্ষায় অংশ নেন ৩৪তম বিসিএসের দুই হাজার ১৮৯ কর্মকর্তা। কিন্তু তাদের অধিকাংশই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। অনুত্তীর্ণরা একই ব্যাচের পাস করা কর্মকর্তাদের চেয়ে নানা সুবিধা থেকে পিছিয়ে পড়বেন। আগের ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেওয়ার পরও অনুত্তীর্ণ হয়েছেন। উত্তীর্ণ হওয়া বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এতে উত্তীর্ণ না হলে বেতন-ভাতাও বাড়ে না, রাষ্ট্রীয় কাজও ব্যাহত হতে পারে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ৩৪তম বিসিএস কর্মকর্তাদের সিনিয়র স্কেলে পদোন্নতি পরীক্ষাটি গত বছরের আগস্টে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। করোনার কারণে পাঁচ মাস পিছিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তা নেওয়া হয়। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে তিনটি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। ফল প্রকাশিত হয় চলতি মাসের ৮ তারিখে। উত্তীর্ণ কর্মকর্তাদের বেতন নবম থেকে ষষ্ঠ গ্রেডে পরিবর্তন হবে। ফলে তাদের মূল বেতন হবে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা। ১ জুলাই থেকেই তা কার্যকর হবে। আর প্রশাসনের অনুত্তীর্ণরাসহ কয়েকটি ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিদেশে পদায়ন ও প্রশিক্ষণও পাবেন না।

ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রশাসন ক্যাডারের ২৭৯ জনের মধ্যে ১০৯ জন অনুত্তীর্ণ হয়েছেন, পুলিশে ১২০ কর্মকর্তার ৭৭ জন, পররাষ্ট্রে ২৪ জনের মধ্যে ১১ জন, তথ্যে ৩৮ জনের মধ্যে ২৭, ট্যাক্সে ৩২ কর্মকর্তার মধ্যে ২৩, গণপূর্তে (ই/এম) ১৯ জনের মধ্যে ১৩ ও গণপূর্তে (সিভিল) ৪০ জনের মধ্যে ২৫ জন অনুত্তীর্ণ হয়েছেন। আনসার ক্যাডারে ১৬ জনের মধ্যে ১০ জন, পরিবার পরিকল্পনায় পাঁচজনের মধ্যে চারজন, খাদ্যে চারজনের মধ্যে দু'জন উত্তীর্ণ হতে পারেননি। বিসিএস সাধারণ শিক্ষার অর্থনীতি বিষয়ে ৬২ জনের মধ্যে মাত্র একজন উত্তীর্ণ হয়েছেন। দর্শনে ১৭ জনের মধ্যে সাতজন, উদ্ভিদবিদ্যায় ১১ জনের মধ্যে ছয়জন, ভূগোলে তিনজনের মধ্যে একজন কর্মকর্তা অনুত্তীর্ণ হয়েছেন। অনুত্তীর্ণ কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশিরভাগই তিন বিষয়ের মধ্যে মাত্র একটিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। অনেকে নিজস্ব ক্যাডারের কাজকর্ম সম্পর্কিত বিষয়াদি তৃতীয়পত্রেও পাস করেননি। কয়েকজন কর্মকর্তা আবেদন করার পরও পরীক্ষায় অংশ নেননি।

এ বিষয়ে পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ সমকালকে বলেন, ফল সাধারণত এতটা খারাপ হয় না। বিপুলসংখ্যক প্রার্থী অনুত্তীর্ণ হওয়া পিএসসির জন্য রেকর্ড। কারণ, এ প্রার্থীরাই বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পেয়েছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, চাকরির পর অনেকে পড়াশোনার প্রতি উদাসীন হয়ে যান। আবার মাঠ প্রশাসনে যারা কাজ করেন, তাদের সব সময় কাজের মধ্যে থাকতে হয়। কাজের চাপে তারা সিলেবাস অনুসরণ করে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পান না। এ ছাড়া করোনার মধ্যে অনেক কিছু বদলে গেছে। অনেক পরীক্ষার সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। পিএসসি হয়তো তাদের কোয়ালিটি ও পদ্ধতি বজায় রেখেছে। ফলে একটা বিপর্যয় হয়ে গেছে। আশা করি, কর্তৃপক্ষ বিষয়টিতে নজর দেবেন।

পিএসসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, অনুত্তীর্ণরা আবার পরীক্ষা দিতে পারবেন। পরবর্তীতে তারা পাস করবেন- এমন আশা করা যায়।

অনুত্তীর্ণ একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, যারা দেশের জন্য পরিবার-পরিজনকে ঝুঁকিতে রেখে কাজ করছেন, তাদের পরীক্ষার নামে বঞ্চিত করা হয়েছে। কারণ, অংশগ্রহণকারী সবাই যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই ক্যাডার হয়েছেন। সবাইকে পাস করিয়ে দিলেও কোনো ক্ষতি হতো না। এখন অনুত্তীর্ণ বেশিরভাগ কর্মকর্তা এই ফল পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করেছেন। চলতি সপ্তাহে আরও অনেকে আবেদন করবেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে পিএসসি সদস্য মো. শাহজাহান আলী মোল্লা সমকালকে বলেন, প্রতিবছরই কিছুসংখ্যক প্রার্থী অনুত্তীর্ণ হন। গতবারের মতো এবারও অনুত্তীর্ণ হয়েছেন। ফল পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন বেশি আসেনি। বেশিসংখ্যক আবেদন এলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, পরীক্ষার নম্বর ভুল হওয়ার আশঙ্কা নেই। কারণ, নিরীক্ষকের মাধ্যমে খাতা দেখানো হয়।

প্রশাসন ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসন ক্যাডারের বেশিরভাগ কর্মকর্তা উত্তীর্ণ না হওয়ায় মাঠ প্রশাসনে যথাসময়ে ইউএনও পদায়নে সংকট দেখা দেবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব ও একান্ত সচিব পদেও পদায়ন করা যাবে না।

সিনিয়র স্কেলে পদোন্নতির জন্য তিনটি বিষয়ে ৩০০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রথম পত্র 'বাংলাদেশ ও চলতি বিষয়াবলি', দ্বিতীয় পত্র 'সব সরকারি অফিসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, বিধি ও পদ্ধতি' ও তৃতীয় পত্র 'সংশ্নিষ্ট ক্যাডারের কাজকর্ম সম্পর্কিত বিষয়াদি'। একজন কর্মকর্তা একসঙ্গে তিনটি অথবা কম সংখ্যক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন। তবে এতে অংশ নেওয়ার জন্য চাকরির বয়স কমপক্ষে চার বছর ও স্থায়ী হতে হবে। প্রতিটি পত্রের পূর্ণমান ১০০। পাস নম্বর থাকে ৫০। কোনো কর্মকর্তা কোনো সময়ই উত্তীর্ণ হতে না পারলে তার চাকরির বয়স ১৪ বছর বা নিজের বয়স ৫০ বছর হলে বিশেষ বিবেচনায় সিনিয়র স্কেলে পদোন্নতি পেতে পারেন।

বিষয় : ৩৪তম বিসিএস ক্যাডার

মন্তব্য করুন