প্রাণ-প্রকৃতিতে ভরপুর সিআরবিকে 'ক্ষতবিক্ষত' করা কিছু পুরোনো কাজও নতুন করে আলোচনায় আসছে। বিভিন্ন সময় সিআরবি এস্টেটের জায়গা ইজারা দিয়ে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক স্থাপনা করার সুযোগ করে দিয়েছিল রেলওয়ে। এসব জায়গায় সবুজ গাছগাছালি নিধন করে গড়ে উঠেছে ফিলিং স্টেশন, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ নানা স্থাপনা। এখন হাসপাতাল নির্মাণের চলমান প্রক্রিয়া বন্ধের পাশাপাশি 'টাকা কামানোর' বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়ার দাবিও তুলছেন সিআরবি রক্ষার আন্দোলনকারীরা।

সিআরবি এস্টেটে যেসব বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মিত হয়েছে, এর মধ্যে কয়েকটি গড়ে উঠেছে একবারে সিআরবির প্রাণকেন্দ্র শিরীষতলা ও সাত রাস্তার গা-ঘেঁষে। রেলওয়ে থেকে অনুমোদন ও জায়গা ইজারা নিয়ে গড়া বাণিজ্যিক স্থাপনার পাশাপাশি অনেক অবৈধ স্থাপনাও রয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) নগরীর মাস্টারপ্ল্যানে সিআরবিকে উন্মুক্ত পরিসর ও সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করলেও তাদের অনুমোদন ছাড়াই বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, দক্ষিণ পাশ দিয়ে সিআরবিতে প্রবেশে দুটি রাস্তা রয়েছে। কদমতলী মোড় সংলগ্ন পিচঢালা রাস্তা দিয়ে সিআরবি এলাকায় প্রবেশমুখেই রয়েছে ফোর স্টার নামে একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন। দেড় দশক আগে রেলওয়ে এই ফিলিং স্টেশন করার জন্য ভূমি ইজারা দিয়েছিল। এই রাস্তার দু'পাশে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে বেশকিছু ঝুপড়ি ঘর ও দোকানপাট। ফিলিং স্টেশন ফেলে সিআরবির দিকে একটু এগোলেই চোখে পড়বে 'বঙ্গবন্ধু যুব জাগরণ ক্লাব'। বড়সড় জায়গা দখল করে ক্লাবঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে। পাকা-টিনশেডের এই ক্লাব ভবনের ওপরে একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। চট্টগ্রামের বিতর্কিত যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের নাম রয়েছে সাইনবোর্ডে। সিআরবি এস্টেটের একেবারে মাঝামাঝিতে শিরীষতলা উন্মুক্ত পরিসর ও সাত রাস্তার মোড়। এখানে রয়েছে বড়সড় একটি রেস্টুরেন্ট। রেলওয়ে থেকে ভূমি ইজারা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে তাসফিয়া নামে এই রেস্টুরেন্টটি। সাত রাস্তা মোড়ের পাশেই রয়েছে 'মুক্তিযোদ্ধা ক্যান্টিন' নামে আরও একটি রেস্টুরেন্ট। রেলওয়ের এক শ্রমিক লীগ নেতার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এটি।

আধা কিলোমিটারের মধ্যে সিআরবির আশপাশে গড়ে উঠেছে আরও তিনটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন। এর মধ্যে টাইগারপাস মোড়ে দুটি ও পলোগ্রাউন্ড মাঠের বিপরীতে একটি। এই তিনটি ফিলিং স্টেশন সিআরবির প্রাণকেন্দ্র থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে থাকলেও কদমতলী মোড়ের ফিলিং স্টেশনটি সিআরবিকে শ্রীহীন করার পাশাপাশি এর পরিবেশেরও ক্ষতি করছে। এর বাইরে ২১০ একরের বিশাল জায়গার মধ্যে রয়েছে আরও কয়েকটি বাণিজ্যিক স্থাপনা।

এ বিষয়ে পরিবেশবিদ ও কর্ণফুলী নদী গবেষক ড. ইদ্রিস আলী সমকালকে বলেন, 'সিআরবি এস্টেটে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অনেক বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। অতীতে রাজনীতির অপচর্চা ও ক্ষমতার অপব্যহারের ফসল হচ্ছে এসব স্থাপনা। মনে রাখতে হবে, ফিলিং স্টেশন হচ্ছে সবুজ গাছগাছালির শত্রু। অথচ সিআরবির দক্ষিণ অংশ দিয়ে প্রবেশের মুখে সামান্য ব্যবধানে দুটি ফিলিং স্টেশন গড়ে তোলা হয়েছে। রেস্টুরেন্টসহ আরও কিছু স্থাপনা করা হয়েছে সিআরবির প্রাণকেন্দ্রে। হাসপাতালের নির্মাণ প্রক্রিয়া বন্ধের পাশাপাশি এগুলোও সরিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়া এসব স্থাপনা কীভাবে হলো এবং এতে কারা জড়িত, তাও খুঁজে বের করতে হবে। সিআরবি রেলের সম্পদ হলেও তারা যা খুশি তা করতে পারে না।'

বিষয়টি স্বীকার করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেনও বলেছেন, 'সিআরবি এলাকায় বিভিন্ন সময় কিছু স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। আবার কিছু অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে। অবৈধ স্থাপনাগুলো খুব শিগগির ভেঙে দেওয়া হবে।'

ফিলিং স্টেশন ও রেস্টুরেন্টের বিষয়ে তিনি বলেন, 'তাসফিয়া রেস্টুরেন্টটি রেলওয়ে থেকে ভূমি লিজ নিয়ে করা হয়েছে। সেখানে চা-কফি বিক্রি করা হয়। অন্য জায়গাগুলোও লিজ নিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।' সংরক্ষিত জায়গায় যে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যায় কিনা- জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, 'সিআরবি হচ্ছে রেলওয়ের জায়গা। এই জায়গায় কীভাবে ব্যবহার হবে রেলওয়ে তা সিদ্ধান্ত নেয়। এই জায়গা সংরক্ষণ করে কে, সেটাও তো একটা বিষয়।'

বিষয় : রেলের ভূমিকায় প্রশ্ন সিআরবি

মন্তব্য করুন