ঈদের ছুটির মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন নারী-শিশুসহ ৩৫ জন। এর মধ্যে বাগেরহাটের ফকিরহাটে বৈলতলী নামক স্থানে ইজিবাইক ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৬ জন, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার কলেজমোড় এলাকায় মাহেন্দ্রতে অজ্ঞাতনামা একটি গাড়ির ধাক্কায় দুই শিশুসন্তানসহ বাবা, নোয়াখালী সদরে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে বাবা-ছেলে, রংপুরের তারাগঞ্জে দুটি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে চারজন, কুমিল্লায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-মেয়েসহ তিনজন মারা গেছেন। এছাড়া পটুয়াখালীতে দু'জন, কুমিল্লার মুরাদনগরে ব্যবসায়ী, রংপুরের মিঠাপুকুরে এক ব্যক্তি, মেহেরপুরে তিনজন, গোপালগঞ্জে এক ব্যক্তি, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় চারজন, ঢাকার ধামরাইয়ে একজন, বগুড়ার শেরপুরে স্কুলছাত্র এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে।

গতকাল শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের বৈলতলী এলাকায় ইজিবাইক ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৬ জন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। আহত ইজিবাইকের যাত্রী নুর মোহম্মদকে (৬০) উদ্ধার করে ফকিরহাট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত যাত্রীদের মধ্যে তিনজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন- ফকিরহাটের নলধা মৌভোগ এলাকার দিলিপ রাহার ছেলে উৎপল রাহা (৪৫), একই এলাকার জগদীশ দত্তের ছেলে নয়ন দত্ত (২৫) ও রামপাল উপজেলার শ্রীফলতলা ইউনিয়নের চাকসী গ্রামের আবদুল হাই (৫৫)।

বাগেরহাট পুলিশ সুপার কে এম আরিফুল হক বলেন, ফকিরহাটের নোয়াপাড়া মোড় থেকে ফকিরহাট বাজারগামী যাত্রীবাহী ইজিবাইকটি বৈলতলী এলাকায় পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবোঝাই দিনাজপুরগামী হিমাচল নামের একটি যাত্রীবাহী বাস রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা কমপ্লেক্সের সামনে এলে বিপরীত দিক সৈয়দপুর থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী বাস হানিফ এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন। এর মধ্যে একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি হলেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার শিংগীমারী গ্রামের তাজিরুল ইসলামের ছেলে শামছুর রহমান (৫০)। আহত হন কমপক্ষে ৩০ জন। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে আহতদের উদ্ধার করে তারাগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করলে আরও একজনের মৃত্যু হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন নীলফামারী সৈয়দপুর উপজেলার মোকছেদুল, দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার রাজা মিয়া, ছাবিনা, পার্বতীপুর উপজেলার কবিরুল ইসলাম, লাবিব, আল-আমিন, আমিনা বেগম, মাজেদা বেগম, নুরুন্নবী, বীরগঞ্জ উপজেলার দেলওয়ার হোসেনসহ অন্যরা।

দৌলতদিয়া-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার কলেজমোড় এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিশুসন্তানসহ বাবা নিহত হয়েছেন। তারা হলেন ইসমাইল শেখ, তার মেয়ে শিখা খাতুন (১৫) ও ছেলে আবদুল মালেক (৫)। তাদের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চরমহেন্দ্রপুর গ্রামে। গত সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে অজ্ঞাতনামা পরিবহনের ধাক্কায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। তারা তিনজনই মাহেন্দ্র পরিবহনে নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন।

ঈদের দিন সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার লালবাগ এলাকায় কাভার্ডভ্যান চাপায় সাজেদুল হক সাজু ও তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে খাদিজা আক্তার সাবা নিহত হয়েছেন। সাজেদুল চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কোমারডোগা গ্রামের হুমায়ুন কবিরের ছেলে। ঈদ উদযাপনের জন্য মেয়েকে নিয়ে মোটরসাইকেলে শ্বশুরবাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন সাজু। অপর দিকে, ঈদের পরের দিন একই মহাসড়কের দাউদকান্দি উপজেলার শহীদনগর এলাকায় বাসচাপায় কমলা বেগম (৬৫) নামে এক নারী নিহত হয়েছেন। তিনি দাউদকান্দি উপজেলার ইছাপুর গ্রামের আবদুর রশিদ শিকদারের স্ত্রী। কমলা বেগমের ছেলে জিয়ারুল শিকদার জানান, ঈদ উপলক্ষে সকালে তার মা-বাবা একই উপজেলার নূরপুর গ্রামে খালার বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। শহীদনগরে বাস থেকে নামার পর মহাসড়ক পার হচ্ছিলেন। এ সময় তিশা পরিবহনের একটি বাস তার মাকে চাপা দেয়।

নোয়াখালী সদরে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে বাবার মৃত্যুর ৬ দিন পর মারা গেছে ছেলে। নিহত ইয়াসিন অভি (১৭) কবিরহাট উপজেলার নরোত্তম পুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের গাজী ভূঞা বাড়ির মোয়াজ্জেন হোসেন ওয়াসিমের ছেলে। সে উপজেলার সদর নরোত্তমপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। গত ১৬ জুলাই রাত ৮টার দিকে সদর উপজেলার ১১নং নেয়াজপুর ইউনিয়নের কাশেম বাজার এলাকায় দুটি অটোরিকশার সংঘর্ষে অভির বাবা মোয়াজ্জেন হোসেন ওয়াসিম (৪০) ঘটনাস্থলেই মারা যান।

পটুয়াখালীতে মাইক্রোবাস পুকুরে পড়ে চালকসহ দু'জন নিহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মহাসড়কের শরীফ বাড়ির বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এক মোটরসাইকেল চালককে বাঁচাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাইক্রোবাসটি পুকুরে পড়ে গেলে চালক মাহবুব হাওলাদার (২৮) ও ইমরুল কবির (২০) নামে একজন মারা যান।

কুমিল্লার মুরাদনগরে রাস্তার ওপর দিয়ে টানা ড্রেজারের পাইপ লাইনের কারণে শাহ আলম সরকার নামে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন নিহতের ছেলে শহিদউল্লাহ সরকার। গত মঙ্গলবার রাতে উপজেলার আমিনগর মোড়ে ওই লাইনে তাদের মোটরসাইকেলটির ধাক্কা লেগে এ দুর্ঘটনা ঘটে। শাহ আলম সরকার পাশ্ববর্তী হোমনা উপজেলার মাইজচর গ্রামের মৃত আতাব আলীর ছেলে।

এদিকে, রংপুরে কোরবানির জন্য গরু কিনে ভটভটিতে বাড়ি ফিরছিলেন মোকছেদুল ইসলাম। পথে ভটভটি উল্টে রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। মিঠাপুকুর উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের বোয়ালমারী গ্রামে ঈদের আগের দিন এ দুর্ঘটনা ঘটে। মোকছেদুল ইসলাম (৪০) ওই ইউনিয়নের উদয়পুর গ্রামের বাসিন্দা।

মেহেরপুর মুজিবনগর উপজেলার মানিকনগর গ্রামে দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দু'জন। ঈদের দিন বিকেলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন সদর উপজেলার গাঁড়াডোব গ্রামের রিয়াজুল ইসলামের ছেলে মুস্তাকিম, মুজিবনগর উপজেলার মাঝপাড়া গ্রামের মিনারুল ইসলামের ছেলে শামীম এবং একই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে শাকিল।

গোপালগঞ্জে ট্রাকচাপায় মামা এসএসসি পরীক্ষার্থী ছালিম ফরাজী (১৬) নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ভাগ্নে এসএসসি পরীক্ষার্থী নাহিদুল ইসলাম সরদার (১৬)। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোপালগঞ্জ শহরের বেদগ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। রাত ১১টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছালিম খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়। সে বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার গোলারগাতি গ্রামের আমজেদ ফরাজীর ছেলে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া অংশের আলীপুরা এলাকায় গত বৃহস্পতিবার ভোরে ঢাকাগামী একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে লিসা ও জারা নামে দু'জন এবং তাদের গাড়িচালক নয়ন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া শুক্রবার ভোরে অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় পথচারী মান্নান মিয়া (৭৫) নিহত হয়েছেন। তিনি গজারিয়ার ফরাজীকান্দি গ্রামের প্রয়াত ইমাম আলীর ছেলে। গজারিয়া থানার ভবেরচর হাইওয়ে পুলিশের এসআই সাকিব হাসান জানান, লিসা ও জারা কুমিল্লায় বন্ধুর বাড়ি থেকে ফেরার পথে ওই দুর্ঘটনায় পড়ে।

ঢাকার ধামরাইয়ে ঈদের আনন্দ উদযাপনে বের হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মেহেদী হাসান (১৭) নামে মোটরসাইকেল চালক দশম শ্রেণির ছাত্র নিহত হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছে তার অন্য আরোহী ছোট দুই ভাই মাহিম হাসান (১১) ও তার চাচাতো ভাই নাইম হাসান (১৬)। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কালামপুর-সাটুরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের ধামরাইয়ের জালসা বউ বাজার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। মেহেদী হাসান ধামরাইয়ের সুতিপাড়া ইউনিয়নের বাথুলি গ্রামের রতন মিয়ার ছেলে।

বগুড়ার শেরপুরে যাত্রীবাহী বাসচাপায় অটোভ্যানের যাত্রী স্কুলছাত্র আবদুর রহমান (১২) নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন দু'জন। এর মধ্যে গুরুতর একজনকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঈদের দিন সকালে উপজেলার মহিপুর বাজার এলাকায় ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আবদুর রহমান উপজেলার গাড়ীদহ ইউনিয়নের মহিপুর বুড়িতলা গ্রামের রানা মিয়ার ছেলে।

কক্সবাজারের চকরিয়ায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বাধীন ট্রাভেলস পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস বিপরীত দিক থেকে আসা চাঁন্দের গাড়িকে (জিপ) ধাক্কা দিলে সেটি খাদে পড়ে যায়। এতে নিহতরা হলেন চকরিয়ার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের স্টেশন এলাকার বাসিন্দা আবু ছৈয়দের স্ত্রী সুফিয়া বেগম (৩০) ও জিপের হেলপার বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সিরাজ কারবারি পাড়ার তৈয়ব আলীর ছেলে আলী হোসেন (১২)। আহত হন ১০ জন। এ ছাড়া বুধবার সকালে ঈদসামগ্রী কিনে বাড়ি ফেরার পথে যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের ধাক্কায় নিহত হন পথচারী বশির আহমদ (৫৫)। তিনি খুটাখালী ইউনিয়নের মধ্যম গর্জনতলী গ্রামের মৃত পেটান আলীর ছেলে।

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্নিষ্ট এলাকার সমকালের অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা)





মন্তব্য করুন