বিধিনিষেধ শিথিলের সুযোগে কয়েক লাখ মানুষ ঈদ উদযাপনে ঢাকা ছেড়েছেন। এর একটি অংশকে জীবিকার তাগিদে ঈদের পরদিনই ঢাকা ফিরতে হয়েছে। ঈদের আগের কয়েক দিনে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষের মধ্যে যারা ফিরেছেন, মূলত তারা ফেরার জন্য এক দিনই সময় পেয়েছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ট্রেন ও বাস অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করতে পেরেছে। ফলে টিকিটের জন্য হাহাকার ছিল। লঞ্চে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ফিরেছে গাদাগাদি করে। ঢাকা ফিরে বাসা বা বাড়িতে

পৌঁছতেই রাস্তায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে যারা শুক্রবার ভোরে বা সকালে ঢাকা পৌঁছেছেন, তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশায় অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে তাদের। অনেকে হেঁটেই বাসায় পৌঁছেছেন।

বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মোসাদ্দেক হোসেন ঈদের ছুটিতে পরিবারের লোকজন নিয়ে গ্রামের বাড়ি বরিশালে গিয়েছিলেন। করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে 'কঠোরতম' বিধিনিষেধ শুরুর আগেই গতকাল শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে লঞ্চে ঢাকার সদরঘাটে নামেন তিনি। এর পরই শুরু হয় ভোগান্তি। কোনো না কোনো যানবাহন পাওয়ার আশায় ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে ছিলেন সদরঘাটেই। কিন্তু পাননি। পরে হেঁটেই বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। মোসাদ্দেকের মতো ঢাকায় ফেরা হাজারো মানুষ বিপাকে পড়েন।

শুধু সদরঘাটে নয়, রাজধানীর প্রবেশপথ গাবতলী, উত্তরা-আবদুল্লাহপুর, পোস্তগোলা-বাবুবাজার ও ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী পয়েন্টেও ছিল ভোগান্তির অভিন্ন চিত্র। ঈদের ছুটি শেষ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুক্রবার ভোর ও সকালে মানুষ ঢাকা এবং ঢাকার অদূরে বিভিন্ন পয়েন্টে পৌঁছায়। কিন্তু ততক্ষণে লকডাউন শুরু হয়ে যায়। যে কারণে দূরপাল্লার অনেক যাত্রীবাহী বাসও রাজধানীর ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। যে যেখানে নেমেছে, সেখান থেকেই বাধ্য হয়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হতে হয়েছে। কিছু মানুষ রিকশা পেলেও ভাড়া গুনতে হয়েছে কয়েকগুণ বেশি।

ইলিয়াস তালুকদার কাজ করেন পল্লবী এলাকার একটি তৈরি পোশাক কারখানায়। ঈদের ছুটিতে তিনি ঝালকাঠিতে গ্রামের বাড়ি গেলেও গতকাল সকালে লঞ্চে ঢাকায় ফেরেন। সঙ্গে স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান। লঞ্চ থেকে নেমে তিনি পল্লবী যেতে কোনো বাহনই পাননি। স্ত্রী-সন্তান ও দুটি মাঝারি আকারের ব্যাগ নিয়ে বাধ্য হয়েই হাঁটা শুরু করেন। ভিড় ঠেলে তিনি সদরঘাট থেকে পুরান ঢাকার রায়সাহেব এলাকা পর্যন্ত আসতে পারেন। সেখানে তিনি পল্লবী যেতে কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দর কষাকষি করছিলেন। তাদের একজন নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে চাইলেও বারশ টাকা ভাড়া চান। ইলিয়াস শেষ পর্যন্ত শেওয়াড়াপাড়া পর্যন্ত ৭০০ টাকায় রিকশা নিতে পেরেছিলেন।

রিকশায় ওঠার আগে তিনি বলেন, সাত দিন ধরে মানুষ গ্রামে গেছে। আসার জন্য সময় মাত্র এক দিন। তাও আবার বাসায় পৌঁছানোর কোনো বাহন নেই। দু-একটি রিকশা পাওয়া গেলেও ভাড়া শুনে যে কারও মাথা গরম হওয়ার কথা।

লকডাউনের মধ্যে ঢাকায় ফিরেছেন কেন- জানতে চাইলে ইলিয়াস বলেন, তিনি গার্মেন্টে কাজ করেন। তার স্ত্রী বিভিন্ন বাসায় গিয়ে টিউশনি করান। গার্মেন্ট বন্ধ থাকলেও স্ত্রীর জন্যই তাদের ঢাকায় ফিরতে হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতে পঞ্চগড় থেকে গাবতলীতে নামেন ফেরদৌস হাবীব। তিনি জানান, ঈদের আগের দিন গেছেন। আবর পরদিনই ফিরতে হলো। রোববার অফিস খুললেও শুক্রবার থেকে লকডাউন শুরু হওয়ায় বৃহস্পতিবারই ফিরতে হলো। বাসের টিকিট পেতে অতিরক্তি টাকা দিতে হয়েছে। তবে গাবতলীতে নেমে খুব ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ঘণ্টাখানে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো বাহন পাচ্ছিলেন না। পরে ফার্মগেটে যাওয়ার জন্য দ্বিগুণ ভাড়ায় রিকশা ঠিক করেন তিনি। ফেরদৌসের মতো অনেককেই বৃহস্পতিবার দিনভর এমন ভোগান্তি নিয়ে ঢাকায় ফিরতে হয়েছে।

মন্তব্য করুন