শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস আরও একটি গৌরবময় আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলেন। তাকে 'অলিম্পিক লরেল'-এ ভূষিত করেছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি। শুক্রবার টোকিওতে অনুষ্ঠিত 'অলিম্পিক গেমস ২০২০'-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাকে এই বিশেষ সম্মান জানানো হয়। ড. ইউনূস এ পুরস্কার পাওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি।

পুরস্কার পাওয়ার পর 'তিন শূন্য'র বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ক্রীড়ার সামাজিক মাত্রার দিকটিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। ক্রীড়াবিদরা পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার কাজে নেতৃত্ব দিতে পারেন; একটি 'তিন শূন্য'র পৃথিবী গড়ে তুলতে পারেন। এই তিন শূন্য হচ্ছে কার্বন নিঃসরণ শূন্যতে নামিয়ে আনা, দরিদ্রতা চিরতরে দূর করতে সম্পদ কেন্দ্রীকরণ শূন্যতে নামিয়ে আনা এবং প্রতিটি মানুষের সহজাত উদ্যোক্তা-শক্তি বিকাশের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব শূন্যতে নামিয়ে আনা। এই তিন শূন্যের মাধ্যমে একটি নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করা সম্ভব এবং সেটি ক্রীড়াবিদরা সম্ভব করতে পারেন।

ক্রীড়ার মাধ্যমে শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন ও শান্তিতে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি বিশেষ সম্মাননা 'অলিম্পিক লরেল' প্রদান করে থাকে। ২০১৬ সালে রিও-অলিম্পিক থেকে এ পুরস্কার চালু হয়। তখন থেকে প্রতি গ্রীষ্ফ্মকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এটি প্রদান করা হচ্ছে। প্রথম 'অলিম্পিক লরেল' পান কেনিয়ার ক্রীড়াবিদ কিপচোগে কেইনো।

ক্রীড়ার মাধ্যমে একটি অধিকতর শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির যে মিশন, তার সাফল্য কামনা করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, মানুষকে সমবেত করতে পৃথিবীতে অলিম্পিক গেমস ও ক্রীড়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। অলিম্পিক গেমস শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যকে মহিমান্বিত করার মাধ্যমে পুরো পৃথিবীকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। পিয়াংচেংয়ে ২০১৮ শীতকালীন অলিম্পিকে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার অ্যাথলেটদের সমবেত জাতীয় কুচকাওয়াজ ক্রীড়ার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিপুল সম্ভাবনার কথাই প্রবলভাবে মনে করিয়ে দেয়। 'অলিম্পিক যুদ্ধবিরতি' স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা, শান্তি, মানবতা ও সমঝোতার ভিত্তিতে একটি উন্নততর পৃথিবী সৃষ্টির লক্ষ্যকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, খেলাধুলার মধ্যে পৃথিবীকে উদ্দীপিত করে জীবনকে পরিবর্তিত করার ক্ষমতা রয়েছে। আর এই ক্ষমতাকে উন্মোচিত করতে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো সামাজিক ব্যবসা। আমরা এই শক্তিকে সবচেয়ে কার্যকর উপায়ে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করতে পারি।

পুরস্কার প্রদান করে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির প্রেসিডেন্ট টমাস বাখ বলেন, ক্রীড়ার মধ্য দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সমাজ উন্নয়নের আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ড. ইউনূসের কাজ দৃষ্টান্তমূলক। তিনি উদারভাবে তার বিপুল জ্ঞানভান্ডার দিয়ে খেলোয়াড় ও অলিম্পিক কমিউনিটিকে সমৃদ্ধ করছেন। তিনি খেলোয়াড়দেরকে তাদের খেলা-পরবর্তী জীবনে সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল ব্যবসা উদ্যোক্তায় পরিণত হতে সহায়তা করছেন এবং এভাবে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যতে অবদান রাখার মূল্যবোধকে তুলে ধরছেন। তিনি বিশেষ করে 'প্যারিস ২০২৪'-এর মধ্য দিয়ে অলিম্পিক গেমসের জন্য একটি নতুন মডেল তৈরিতে সহায়তা করে যাচ্ছেন, যেখানে পরিবেশকে সর্বনিম্ন মাত্রায় বিঘ্নিত করে আয়োজক দেশ তার সংস্কৃতি ও মানুষের জন্য সর্বোচ্চ অর্জন নিশ্চিত করতে পারবে।

ড. ইউনূসকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে অলিম্পিক কমিটির চেয়ারম্যান বলেন, তিনি আমাদের সবার কাছে এক বিশাল প্রেরণা।

ইউনূস সেন্টারের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অধ্যাপক ইউনূসকে ক্রীড়ার মাধ্যমে সমাজ উন্নয়নে তার বিপুল কর্মকাণ্ডের জন্য এই 'অলিম্পিক লরেল' প্রদান করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে খেলাধুলার মধ্য দিয়ে সামাজিক সমস্যা সমাধানে 'ইউনূস স্পোর্টস হাব' নামে একটি বৈশ্বিক সামাজিক ব্যবসা নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা। এ ছাড়াও তিনি আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির বেশ কয়েকটি প্রকল্পে সহায়তা করছেন, যেমন আইওসি ইয়াং লিডার্স প্রোগ্রাম, 'ইমাজিন' পিস ইয়ুথ ক্যাম্প এবং অ্যাথলেট ৩৬৫ বিজনেস অ্যাকসিলারেটর, যা অলিম্পিয়ানদের ক্যারিয়ার উত্তরণে সহায়তা করতে প্রথম ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোক্তা কর্মসূচি।

'অলিম্পিক লরেল' ট্রফির অধোভাগটি তৈরি করা হয়েছে প্রাচীন অলিম্পিক গেমসের সঙ্গে প্রতীকী সংযোগ হিসেবে গ্রিসের অলিম্পিয়ার একটি পাথরের রেপ্লিকা দিয়ে। পাঁচটি মহাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে ২০২০ সালের অলিম্পিক লরেলের জন্য বাছাই প্যানেল করা হয়েছিল। এর সদস্যরা ছিলেন- এশিয়া মহাদেশের পক্ষে বিশ্বখ্যাত জাপানি চিত্রপরিচালক নাওমি কাওয়াসে, দুই আমেরিকার পক্ষে খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ও কানাডার প্রাক্তন গভর্নর জেনারেল জুলি পেয়েট, আফ্রিকার পক্ষে ইউএন উইমেনের নির্বাহী পরিচালক দক্ষিণ আফ্রিকার ফুমজিল লামবো-এনকুকা, ওশেনিয়ার পক্ষে প্যাসিফিক আইল্যান্ড ফোরাম সেক্রেটারিয়েটের সেক্রেটারি জেনারেল ও পাপুয়া নিউগিনির রাজনীতিবিদ ডেম মেগ টেলর এবং ইউরোপের পক্ষে ছিলেন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির অনারারি প্রেসিডেন্ট জ্যাক রগ। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির প্রেসিডেন্ট টমাস বাখ জুরি বোর্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির অভিনন্দন :অলিম্পিক লরেলে ভূষিত হওয়ায় ড. ইউনূসকে অভিনন্দন জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল শনিবার দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, শান্তিতে নোবেল জয় করে যেমন ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশকে গৌরবান্বিত করেছেন, তেমনি বিশ্ব ক্রীড়াজগতের সর্বোচ্চ এই সম্মানপ্রাপ্তিতে বাংলাদেশের জনগণও আনন্দিত ও গৌরবান্বিত।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সাফল্য কামনা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান।



মন্তব্য করুন