রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাসিন্দা ফুলবাঁশী দাস তার দুই শিশু সন্তান সুমি দাস ও ঝুমা দাসকে নিয়ে শুক্রবার রাতে বাসায় ঘুমিয়ে ছিলেন। তারা এক কক্ষের বাসার খাটে ঘুমালেও ফুলবাঁশীর স্বামী মুকুন্দ চন্দ্র দাস মেঝেতে ঘুমান। গতকাল শনিবার ভোরে সেখানেই মেলে ফুলবাঁশী ও তার ছোট মেয়ে সুমি দাসের মরদেহ।

প্রাথমিকভাবে পুলিশ বলছে, শুক্রবার গভীর রাতে মুকুন্দ দাস তার স্ত্রী ও মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে বলে মনে হচ্ছে। এর পর নিজেও বিষাক্ত কিছু খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। বড় মেয়ে ঝুমা দাসকেও হয়তো হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সে ঘুম থেকে জেগে যাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।

কেন এ হত্যাকাণ্ড- সে বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহ বা সাংসারিক বিষণ্ণতা থেকে এমন ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটাতে পারে মুকুন্দ। সে পেশায় ঠেলাগাড়ি চালক হলেও মাঝেমধ্যে ভ্যান গাড়িতে সবজি বিক্রি করত। স্থানীয় লোকজন বলছেন, মুকুন্দ দাস ১০ বছর ধরে কামরাঙ্গীরচরের নয়াগাঁও এলাকার ৩ নম্বর গলির ওই বাসাতে পরিবার নিয়ে থাকছে। তার স্ত্রী ফুলবাঁশী দাস (৩৪) গৃহবধূ। ১২ বছর বয়সী মেয়ে সুমি দাস স্থানীয় একটি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। বেঁচে যাওয়া ১৪ বছর বয়সী ঝুমা দাস একই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

ঘটনার সময় বাসায় থাকা ঝুমা দাস জানায়, তারা প্রায় অভিন্ন সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু পাশে শুয়ে থাকা ছোট বোন সুমিকে ছটফট করতে দেখে তার ঘুম ভেঙে যায়। তখন একটি পলিথিন দিয়ে বাবাকে সুমির মুখমণ্ডল চেপে ধরে থাকতে দেখে সে।

কামরাঙ্গীরচর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তফা আনোয়ার সমকালকে বলেন, ঝুমা তখন তার বাবা মুকুন্দ দাসকে জিজ্ঞেস করেছিল, বাবা, এটা কী করছে? কেন করছে? তখন বাবা তাকে বলেছিল, সুমি বমি করছে। তাই মুখে পলিথিন দিয়ে রেখেছে। এর পরই সে কান্না করে অপর পাশে থাকা মাকে ঘুম থেকে তোলার চেষ্টা করে। মা ঘুম থেকে না ওঠায় চিৎকার করে ঝুমা। এতে প্রতিবেশীরা ঘুম থেকে জেগে ওই বাসায় যান। খবর পেয়ে পুলিশ ভোরে সেখানে গিয়ে দু'জনের লাশ উদ্ধার করে।

পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, তারা ধারণা করছেন, মুকুন্দ আগেই স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এর পর ছোট মেয়েকে একইভাবে মেরে ফেলে। দু'জনের গলাতেই শ্বাসরোধের আঘাতের চিহ্ন মিলেছে। ওই দু'জনকে হত্যার পর নিজেও বিষাক্ত কিছু খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। তাকে আটক দেখিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সুস্থ হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন মুকুন্দ দাসের সঙ্গে গতকাল বিকেলে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তখন সে সমকালকে জানায়, সে কাউকে মারেনি। সবাই মিলে ছারপোকা মারার বিষ খেয়েছিল। কেন এটা খেয়েছে- এমন প্রশ্নে সে অসংলগ্ন তথ্য দেয়। এক পর্যায়ে বলতে থাকে, নিজেই সবাইকে মেরেছে।

অবশ্য কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মুকুন্দ শুরু থেকেই অসংলগ্ন তথ্য দিয়ে আসছে। তাকে সুস্থ করে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তখন হয়তো সব বিষয়ে পরিস্কার হওয়া যাবে। তা ছাড়া তার মেয়ে ঝুমা দাসও কিছু তথ্য দিয়েছে। মা-মেয়ের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। মৃত্যুর আগে তারা বিষাক্ত কিছু খেয়ে থাকলে ফরেনসিক প্রতিবেদনেই তা উঠে আসবে। তা ছাড়া সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটও আলামত সংগ্রহ করেছে।

মুকুন্দ কেন স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যা করবে- এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, মুকুন্দ ঋণগ্রস্ত। টানাটানির সংসার। এসব কারণে কলহ চলছিল বলে পুলিশ প্রতিবেশীদের মাধ্যমে জানতে পেরেছে। নানা টানাপোড়েনে মুকন্দ বিষণ্ণও ছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সবকিছু পরিস্কার হবে। মামলার প্রস্তুতি চলছে।





মন্তব্য করুন