গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য কার্যকরের বিষয়টি ক্রমশই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে এই শর্ত পূরণের অঙ্গীকার করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে নিবন্ধন নিয়েছিল দলগুলো। দেড় বছর আগে ওই সময় পেরিয়ে গেলেও এই শর্ত পূরণে কারও কোনো তৎপরতা নেই।

এদিকে ইসির পক্ষ থেকে দশ বছরের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবও আইন মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। এ আইন সংশোধন নিয়ে ইসির কয়েক দফা প্রস্তাবে বিভ্রান্ত আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারাও। ইসির পক্ষ থেকে আরপিওর সংশ্নিষ্ট ধারা সংশোধন করে নির্ধারিত মেয়াদ তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে পিছু হটেছে ইসি। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব দেখানো হয়েছে। সম্প্রতি অন্যতম নিবন্ধিত দল 'বিকল্পধারা'র পক্ষ থেকে ইসিকে চিঠি দিয়ে সংশ্নিষ্ট ধারাটি বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসির আইন সংস্কার কমিটির চেয়ারম্যান ও নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানম বলেন, অনেকগুলো আইন সংশোধনের জন্য মন্ত্রণালয়ে সংশোধনী পাঠানো হয়েছিল। তারা আশা করছেন এসব প্রস্তাবে সরকার দ্রুত সাড়া দেবে এবং কম সময়ের মধ্যেই আইনটি সংশোধন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ইসির প্রস্তাবে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের বিদ্যমান বিধান বহাল রেখে ১০ বছর সময় বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে। তার মতে, সংশোধনের কাজ সম্পন্ন না হলেও আইনটির প্রস্তাব ইসির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে করা হয়েছে। ওই প্রস্তাব এখনও নাকচ হয়নি। নাকচ না হওয়ার আগ পর্যন্ত এটা আইনের বাইরে চলে গেছে বলা যাবে না। ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব পর্যায়ের কমিটিতে নারী নেতৃত্ব ৩৩ শতাংশ নিশ্চিত করার শর্তে ২০০৮ সালে ইসির নিবন্ধন পায় রাজনৈতিক দলগুলো। নারী নেতৃত্বের বিষয় আরপিওতে বলা হয়েছে, 'যদি কোনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত হতে চায়, তবে নিম্নলিখিত শর্তগুলোর মধ্যে একটি পূরণ করবে- কেন্দ্রসহ সব পর্যায়ের কমিটিতে নারীদের জন্য কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ পদ সংরক্ষণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে এবং ধারাবাহিকভাবে ২০২০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে।' আরপিওর কোনো বিধান লঙ্ঘিত হলে সংশ্নিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল বলে গণ্য হবে বলেও উল্লেখ রয়েছে সেখানে।

২০২০ সালের সময়সীমা চলে গেলেও হাতে গোনা দু-একটি দল ছাড়া কেউ ২০ শতাংশেরও বেশি নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি। এ অবস্থায় কমিশন রাজনৈতিক দল থেকে মতামত নিয়ে আইন সংশোধন করে ২০৩০ সাল করার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। আইনটি কয়েক দফা চালাচালি করে এখন ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে।

গত ৭ জুন ইসির পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নিবন্ধনের শর্ত স্মরণ করিয়ে দিয়ে এর অগ্রগতি সম্পর্কে ৩০ দিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছিল। এর আগে ২০১৭ সালের

অক্টোবর মাসেও রাজনৈতিক দলকে একই ধরনের চিঠি দিয়েছিল ইসি।

ইসির এই চিঠির জবাবে ২৭ জুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর এক চিঠিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান এমপির সই করা এক চিঠিতে বলা হয়- '২০২০ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ অন্যান্য সকল কমিটিতে ৩৩ ভাগ পদ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। শুধু শর্ত পূরণের স্বার্থে সকল কমিটিতে ৩৩ ভাগ পদ নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা রাজনৈতিক কার্যক্রমকে নিরুৎসাহিত করার শামিল। এই শর্ত পালন বাস্তবতার নিরিখে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কাজেই রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের এই শর্ত বাতিল হওয়া উচিত বলে তারা বিশ্বাস করে।'

ইসিতে পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল গণফ্রন্ট জানিয়েছে, তাদের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২৪ শতাংশের কম নারী নেতৃত্ব রয়েছে। বিএনপির সব পর্যায়ের কমিটিতে ১৫ ভাগ নারী সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাপায় নারী নেতৃত্ব মাত্র ২০ শতাংশ। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি-জেপিতে নারী নেতৃত্ব ১৬ শতাংশ।

এছাড়া অন্যান্য দলের মধ্যে সিপিবিতে ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ ও জাসদে ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রয়েছে। এনপিপির ২০ শতাংশ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ৬ শতাংশ, গণতন্ত্রী পার্টিতে ১৫ শতাংশ ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টে ১ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রয়েছে। কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলিডিপির) কমিটিতে নারী নেতৃত্ব রয়েছে ২২ শতাংশ।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, নারী নেতৃত্বের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে তিন ধরনের প্রস্তাব পাঠিয়েছে কমিশন। প্রথম প্রস্তাবে রয়েছে আরপিওর হুবহু বাংলা অনুবাদ, যেখানে ২০২০ সালের মধ্যে সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। দ্বিতীয় প্রস্তাবে কমিটিতে নারী নেতৃত্ব রাখাসহ কয়েকটি বিষয় বাদ দিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) আইনে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছিল। তৃতীয় প্রস্তাবে 'নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন-২০২০' পাস এবং এতে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ তিনটির মধ্যে কোন প্রস্তাবটি আইন মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানতে পারেনি ইসি।

মন্তব্য করুন