'পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনী .../ একদিন ভাবি নাই মনে', 'তুমি জান না রে প্রিয়/ তুমি মোর জীবনের সাধনা', 'এ পৃথিবী যেমন আছে তেমনই ঠিক রবে/ সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে', 'নবী নামের নৌকা গড়/ আল্লাহ নামের পাল খাটাও/ বিসমিল্লাহ বলিয়া মোমিন/ কূলের তরী খুলে দাও', 'জানিতে চাই দয়াল তোমার আসল নামটা কী'- এ রকম অসংখ্য গানের স্রষ্টা বাংলা কবিগানের অন্যতম প্রধান পুরুষ চারণকবি বিজয় সরকার। শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে পেয়েছেন মরণোত্তর একুশে পদক।

বিজয় সরকারের জন্মভিটা নড়াইল সদরের ডুমদি গ্রামে একযুগ আগে নির্মাণ করা হয়েছিল 'বিজয় সরকার মঞ্চ'। এই মঞ্চ এখন ব্যবহূত হচ্ছে গরু রাখার স্থান হিসেবে। আর গ্রিন রুম ও চত্বরে রাখা হচ্ছে গরু ও মাছের খাবার এবং জ্বালানি। গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রায় সাত লাখ টাকা ব্যয়ে এই বিজয় মঞ্চ নির্মাণ করা হয়। কবি যেখানে বসবাস করতেন, সেখানে একটি টিনশেড ঘরও রয়েছে। পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হচ্ছে কবির ব্যবহূত খাট, পাদুকা, পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র। বসতভিটায় কবি পরিবারের কেউ না থাকায় গ্রামবাসীর সহায়তায় ছয় বছর আগে ডুমদি গ্রামের বাসিন্দা বিমল সিকদার নামে এক ব্যক্তি দেখাশোনা করলেও তিনি নিজেই বিজয় সরকার মঞ্চকে গোশালা বানিয়ে রেখেছেন।

তারা আরও বলেন, এখানে পল্লী বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলেও বিলের অর্থ পরিশোধের অভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। টয়লেট থাকলেও সেখানে পোকামাকড়ের ঘরবসতি। ৩৫ বছরেও সংরক্ষণ হয়নি বিজয় সরকারের ব্যবহূত জিনিসপত্র। বিজয় স্মৃতি সংগ্রহশালা নির্মাণের জন্য এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবিও পূরণ হয়নি।

বিজয় সরকার

নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের চিত্রাঙ্কন বিভাগের শিক্ষক নিখিল চন্দ্র দাস বলেন, কিছুদিন আগে বিজয় সরকারের বাড়ি গিয়েছিলাম। দেখলাম কবি মঞ্চ, গ্রিন রুম এবং ওই এলাকা ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। কয়েক যুবক সেখানে গাঁজা সেবন করছে। একই কথা বলেছেন মূর্ছনা সংগীত নিকেতনের নৃত্যের শিক্ষক বিকাশ সিকদার।

বাঁশগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ভবরঞ্জন রায় বলেন, কয়েক মাস আগে বিজয় মঞ্চ ও গ্রিন রুম থেকে গরু-মাছের খাবারসহ ওই এলাকা পরিস্কার করার ব্যবস্থা করেছিলাম। আবারও সেই আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। তিনি আরও বলেন, দূরদূরান্ত থেকে প্রতিদিন শতাধিক বিজয়ভক্ত এখানে আসেন। কিন্তু বর্ষাকালে বিপাকে পড়েন তারা। এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পাকাকরণের জন্য বিভিন্ন সময় সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দেনদরবার করেছি। কয়েক মাস আগে এলজিইডির মাধ্যমে এমপির বিশেষ প্রকল্পের মধ্যে এই রাস্তাটি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নড়াইল-২ আসনের সাবেক এমপি বিজয় সংগ্রহশালা নির্মাণের জন্য ১৬ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন। তারপর আর কী হয়েছে বলতে পারব না।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সমকালকে বলেন, বিজয় মঞ্চের এমন বেহাল অবস্থা সম্পর্কে আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দ্রুত এসব অপসারণের ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ ছাড়া এক কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণের বিষয়ে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলব। বিজয় সংগ্রহশালা নির্মাণের প্রস্তাবনা কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে ব্যাপারেও খোঁজখবর নিচ্ছি।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবিয়াল বিজয় সরকার ১৯০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদরের ডুমদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ভারতের হাওড়ার বেলুডে পরলোকগমন করেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের কেউটিয়ায় তাকে সমাহিত করা হয়। বিজয় সরকার এক হাজার ৮০০-এর বেশি গান লিখেছেন।

মন্তব্য করুন