কর্ণফুলী চট্টগ্রামের প্রধান নদী, নগরের ৭০ লাখ মানুষের সুপেয় পানির উৎস এটি। এই নদীকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে তাদের জীবন ও জীবিকাও। এর তীরেই গড়ে উঠেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। শতাধিক শিল্পকারখানা আছে এর দুই পাড়ে। এই নদীর কোলঘেঁষে আছে আরেক নদী হালদা। দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রও এ নদী।

এত আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব থাকার পরও দখল-দূষণে বিপর্যস্ত কাঁদছে এ নদী। নগরের ৩৬টি খাল ও নালা দিয়ে প্রতিদিন দুই হাজার ২০০ টন বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই পড়ছে কর্ণফুলীতে। দুই তীরে গড়ে উঠেছে দুই হাজার ১৮১ অবৈধ স্থাপনা। আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও অবৈধ এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে পারেনি জেলা প্রশাসন। মাঝপথেই বন্ধ করে দিতে হয়েছে অভিযান। আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে উল্টো নতুন ঘর উঠছে প্রতিনিয়ত। কর্ণফুলীর কান্না থামাতে একটি মাস্টারপ্ল্যানও প্রণয়ন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গতি নেই এর বাস্তবায়নে।

এ ব্যাপারে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ ইদ্রিছ আলম বলেন, চট্টগ্রামকে বাঁচাতে হলে রক্ষা করতে হবে কর্ণফুলীকে। এটিকে দূষণ ও দখলমুক্ত করতে হলে চূড়ান্ত হওয়া মহাপরিকল্পনা ধরে অ্যাকশনে যেতে হবে। লোক দেখানো অভিযান নয়; কর্ণফুলী রক্ষায় দরকার কার্যকর অ্যাকশন।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বলেন, কর্ণফুলী হচ্ছে চট্টগ্রামের প্রাণ। এটিকে বাঁচাতে তারা এগোতে চান মহাপরিকল্পনা ধরে। এ জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত আছেন তারা। কিন্তু মহাপরিকল্পনা ধরে এখনও কাজ শুরু করেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক বলেন, চূড়ান্ত হওয়া মহাপরিকল্পনা ধরে শিগগির কাজ শুরু করবেন তারা। ক্র্যাশ প্রোগ্রাম, স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা রেখে ১০ বছরের এ মহাপরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। করোনার কারণে সব কিছু থমকে যাওয়ায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তিনি জানান, গত মার্চে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা লালদিয়ার চরে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ৫২ একর জমি উদ্ধার করেছেন। নিয়মিত ড্রেজিংও করা হচ্ছে।

এক সংস্থা ভাঙে, আরেক সংস্থা দখল করে :দেখা গেছে, কর্ণফুলী নদীতে জেলা প্রশাসন একদিকে উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে, অন্যদিকে নদীর তীর দখল করে নতুন স্থাপনা নির্মাণ করতে থাকে সরকারের আরেক সংস্থা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। পতেঙ্গায় নদীতীরবর্তী ২৭ একর জায়গায় তারা নির্মাণ করছে লালদিয়া টার্মিনাল। এর পাশে ১৬ একর জায়গায় করা হয়েছে লাইটারেজ জেটি। চারদিকে দেয়াল দিয়ে স্থাপনা নির্মাণের কাজ করে তারা উচ্ছেদ অভিযান চলার সময়ও। খালের একটি অংশ ভরাট করে এ জেটিতে যাওয়ার পথও তৈরি করা হয়।

শুধু তাই নয়, নদীতীরের জায়গা দখলে নিয়ে বেসরকারি একটি কনটেইনার ডিপোকে ২২ একর জায়গা লিজও দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। অথচ জেলা প্রশাসনের তালিকা বলছে, পতেঙ্গায় বন্দরের দখলে থাকা ও লিজ দেওয়া সব স্থাপনাই অবৈধ। দখলে থাকা এমন অবৈধ ভূমির পরিমাণ প্রায় দেড়শ একর। এর দাম দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি। মাপজোখ করে অবৈধ সব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে লালকালির দাগও দিয়ে এসেছিল জেলা প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত পিছু হটে তারা।

সরেজমিন দেখা যায়, পতেঙ্গায় নদীর একেবারে তীর ঘেঁষেই সীমানা দেয়াল দিয়ে লাইটারেজ জেটির স্থাপনার কাজ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বহির্নোঙর থেকে পণ্য খালাসের সুবিধার্থে এখানে পাঁচটি জেটি করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ১৫ কোটি টাকার এ প্রকল্প শুরু হয় ২০১৮ সালের এপ্রিলে। ইনকনট্রেড ডিপোর পাশে থাকা খালে রিটেইনিং ওয়াল দিয়ে আসা-যাওয়ার পথ তৈরি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। জেলা প্রশাসন বলছে, খাল দখল করেই বন্দর কর্তৃপক্ষ তৈরি করছে রাস্তা। এ অংশে তাদের সব প্রকল্পই গড়ে উঠছে আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে।

২০১৮ সালে জেটি নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও ২০১৬ সালেই নদীতীরে নতুন স্থাপনা করতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন আদালত।

তখন উচ্ছেদ অভিযানে সম্পৃক্ত জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, আরএস ও বিএস খতিয়ান ধরে কর্ণফুলী নদীতে উচ্ছেদ অভিযান সম্পন্ন করতে বলেছেন আদালত। মাপজোখ করে পতেঙ্গায় থাকা অবৈধ সব স্থাপনাই লালকালিতে মার্ক করেছেন তারা। ইনকনট্রেড ডিপোর পাশাপাশি বন্দরের নির্মাণাধীন নতুন স্থাপনাও অবৈধ তালিকায় রয়েছে।

অন্যদিকে, বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি এস্টেট ম্যানেজার জিল্লুর রহমান বলেন, কর্ণফুলীর হাই ওয়াটার মার্ক (সাধারণ জোয়ারে নদীর পানি যে সীমানা স্পর্শ করে) ১৫০ ফুট পর্যন্ত বন্দরের এখতিয়ারাধীন। তা ছাড়া আদালত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কোনো স্থাপনা উচ্ছেদ করতে নির্দেশ দেননি। তারা বন্দরের নিজস্ব আইন মেনেই স্থাপনা তৈরি করেন এবং ইজারা দেন।

আদালতের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই গড়ে উঠেছে মৎস্য আড়ত :উচ্চ আদালত ২০১৬ সালে নদীতীরের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার নির্দেশ দিলেও কর্ণফুলীর তীরে এরই মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে মৎস্য আড়ত। নদীতীরে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত চার একর জায়গা প্রথমে দখল করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বছরে ২৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা দর ধরে ১৫ বছরের জন্য এ জায়গা বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের কাছে ইজারা দেয় তারা। এরপর এ জায়গায় মৎস্য আড়ত করে তা ক্রমেই সম্প্রসারণ করেছে সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য সমবায় সমিতি লিমিটেড। প্রথমে ১৮৮টি কক্ষের মৎস্য আড়ত করলেও পরে ২৮টি পিলার বাড়িয়ে আটটি নতুন কক্ষ করা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে আগে পাঁচটি একতলা ও একটি দোতলা ভবন তৈরি করা হয়। 'ইউ' আকৃতিতে তৈরি হওয়া একতলা ভবনের দোকানগুলো করা হয়েছে মাছের আড়ত। দোতলা ভবনটি শৌচাগার ও পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। বন্দরের সচিব ওমর ফারুক সমকালকে বলেন, সাধারণত কর্ণফুলী নদীর হাই ওয়াটার মার্ক ১৫০ ফুট পর্যন্ত বন্দরের এখতিয়ারাধীন। তা ছাড়া নদীকেন্দ্রিক যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনা করে, তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করাও বন্দরের কাজ। এ চিন্তা থেকে তাদের জায়গাটি লিজ দেওয়া হয়েছে।

মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নেও নেই গতি :কর্ণফুলীকে রক্ষায় প্রথমবারের মতো চূড়ান্ত করা মহাপরিকল্পনায় ১০ বছরের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। এতে ৪৫টি মূল কার্যক্রম এবং ১৬৭টি সহযোগী কার্যক্রম চিহ্নিত করা ছিল। অবৈধ দখলে থাকা ভূমি কীভাবে উদ্ধার করা হবে, উদ্ধারকৃত ভূমি কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, এটিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে পর্যটন সুবিধা বাড়ানো যাবে, নগরের বর্জ্য কোথায় কীভাবে বিকল্প স্থানে সংরক্ষণ করা হবে- এসব বিষয়েও ছিল দিকনির্দেশনা। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে তৈরি হওয়া এ মহাপরিকল্পনাও পড়ে আছে হিমাগারে।

থেমে গেছে উচ্ছেদ অভিযান :চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এ নদীর গতিপথ স্বাভাবিক রাখতে ২০১০ সালের জুলাই মাসে 'হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ' নামে একটি সংগঠনের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে কর্ণফুলী দখল, মাটি ভরাট ও নদীতে যে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককেও নির্দেশ দেন আদালত। জরিপ করে নদীর দুই তীরে দুই হাজার ১৮১ অবৈধ স্থাপনা আছে বলে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন। জরিপ প্রতিবেদনটি ২০১৫ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার ও অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে হাইকোর্টে দাখিল করে জেলা প্রশাসন।

এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট বিচারপতি রেজাউল হাসান ও বিচারপতি কাশেফা হোসেনের বেঞ্চ সব স্থাপনা উচ্ছেদে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দেন। কিন্তু তিন মাসের স্থলে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছিল তিন বছর পর। মাত্র ১০ একর ভূমি উদ্ধার করেই উচ্ছেদ অভিযানে ইতি টেনেছে জেলা প্রশাসন। এরপর কর্ণফুলী রক্ষায় নতুন করে চূড়ান্ত করা হয় মহাপরিকল্পনা। এটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

দূষণ বাড়াচ্ছে শিল্প কারখানার বর্জ্য :২০১৯ সালে প্রকাশিত জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এখানে দখলদার আছে চার হাজার ৭০৪ জন। এর মধ্যে মাত্র ২৩০ জনকে উচ্ছেদ করতে পেরেছে প্রশাসন। আবার রিভারাইন পিপলের একটি অপ্রকাশিত সমীক্ষা অনুযায়ী কর্ণফুলীই চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি দখলের শিকার হয়েছে।

এ নদীর দূষণমাত্রাও অন্যান্য নদীর তুলনায় অনেক বেশি। চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার ৮৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অধিকাংশের বর্জ্য শোধনাগার প্লান্ট (ইটিপি) নেই। এসব শিল্প কারখানার বর্জ্য কর্ণফুলীতে মিশে পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে তুলেছে। কর্ণফুলী নদী দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী স্যুয়ারেজ বর্জ্য। চট্টগ্রাম মহানগরীর ৭০ লাখ মানুষের স্যুয়ারেজ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্লান্ট না থাকা কর্ণফুলীর পানি দূষণের প্রধান কারণ। চট্টগ্রাম ওয়াসাকে দিয়ে তাই স্যুয়ারেজের একটি প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। সেটির কোনো সুফল এখনও পায়নি কর্ণফুলী নদী।

পরিবেশ অধিদপ্তর কর্ণফুলী থেকে সংগ্রহ করা পানির নমুনা পরীক্ষা করে ডিজলভড অক্সিজেনের (ডিও) মান ৪ দশমিক ৮ থেকে ৫ দশমিক ৫ এর মধ্যে পায়। এটি উদ্বেগজনক। কারণ, ডিও-এর মান ৪ এর নিচে নামলে তা পানিতে বিদ্যমান জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। অথচ কর্ণফুলী নদীতে পতিত খালগুলোর পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, খালের পানিতে ডিও-এর মান প্রায় শূন্য পর্যায়ে।

মন্তব্য করুন