নিরাপদ ও আরামের ট্রেনযাত্রায় আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে 'পাথর নিক্ষেপ'। চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়ে মেরে এক ধরনের 'মরণ খেলায়' মেতে ওঠে শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। পাথর নিক্ষেপের স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। চলছে রেলওয়ের সচেতনতামূলক কর্মসূচিও। বাড়ানো হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি। এরপরও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা কমছে না। চলন্ত ট্রেনে ভয়ে থাকেন যাত্রীরা। রেললাইনঘেঁষা বস্তি এলাকাগুলো থেকেই পাথর ছোঁড়া হয় বেশি। পাথরের আঘাতে যাত্রীদের কারও মাথা ফেটে যাচ্ছে, কারও চোখ নষ্ট হচ্ছে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে। পাথর নিক্ষেপ বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে রেলওয়ে। সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি এবার কঠোরভাবে আইন প্রয়োগও করা হবে।

২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পাথরের আঘাতে প্রীতি দাশ নামে এক নারী প্রকৌশলীর মৃত্যুর পর ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের বিষয়টি বড় দাগে আলোচনায় আসে। সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ভৈরব রেলস্টেশনের আউটার সিগন্যাল এলাকায় চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনায় ট্রেনের জানালার কাচ ভেঙে সহকারী চালক কাউসার আহমেদের দুই চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭০টি স্পটে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। করোনা মহামারির মধ্যেও চলেছে 'পাথর সন্ত্রাস'। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে চলন্ত ট্রেনে অন্তত ১১০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৯ যাত্রী, ট্রেনের জানালার কাচ ভেঙেছে ১০৩টি। যেসব স্থান থেকে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, সেসব স্থানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করছে রেলওয়ে। এরই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ছয়টি পয়েন্টে এ ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হয়। সংশ্নিষ্ট স্থানের মসজিদের ইমাম, স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক, গণ্যমান্যসহ বিভিন্ন বয়সের লোকের সঙ্গে কথা বলেন রেলওয়ে পুলিশ ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু তাতেও তেমন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বন্ধ হচ্ছে না ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ।

জানা যায়, সারাদেশে ২৫টি পয়েন্টে সবচেয়ে বেশি পাথর ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে পাথর ছোড়া হয় ১০টি পয়েন্টে এবং পশ্চিমাঞ্চলে ১৫টি পয়েন্টে। রেলওয়ের চিহ্নিত করা স্থানগুলোর মধ্যে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে ১০টি পয়েন্টে। এসব পয়েন্ট হচ্ছে- চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা, পাহাড়তলী, কৈবল্যধাম, কসবার ইমামবাড়ি, ফেনীর ফাজিলপুর-কালীদহ এলাকা, নরসিংদী শহর, জিনারদী ও ঘোড়াশাল এলাকা। আর পশ্চিমাঞ্চলে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে ১৫টি পয়েন্টে। এসব পয়েন্ট হচ্ছে- চুয়াডাঙ্গা, নাটোরের আব্দুলপুর, সিরাজগঞ্জ জেলার শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন, সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম রেলওয়ে স্টেশন, পাবনার মুলাডুলি, পঞ্চগড় জেলা ও ঠাকুরগাঁও জেলার কিসমত-রুহিয়া, পাবনার ভাঙুড়া, বগুড়ার ভেলুরপাড়া, গাইবান্ধার বামনডাঙ্গা, জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, সিরাজগঞ্জের সলপ রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, সিরাজগঞ্জের জামতৈল রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, পাবনা জেলার বড়ালব্রিজ রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, খুলনার ফুলতলা স্টেশন এলাকা। ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধের পাশাপাশি এবার আইনের কঠোর প্রয়োগও করা হবে জানিয়ে রেলওয়ে পুলিশ সুপার (চট্টগ্রাম) মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী সমকালকে বলেন, আমরা নানাভাবে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বন্ধে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এতদিন আমরা সচেতনতামূলক কর্মসূচিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। তবে এবার কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগও করা হবে। রেললাইনে সংস্কার-মেরামতে যেসব ওয়েম্যান কাজ করে থাকেন

আমরা তাদেরও সম্পৃক্ত করছি। যখন যেখানে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটবে তখনই সেখানে অভিযান চালিয়ে জড়িতদের বের করে আইনের আওতায় আনা হবে।

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চিফ কমান্ড্যান্ট (পূর্বাঞ্চল) জহিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বন্ধ করতে রেলওয়ে নিরাপত্ত বাহিনী ও রেলওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে নানামুখী কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কখনও যৌথভাবে, আবার কখনও আলাদাভাবে সরেজমিন গিয়ে সচেতনতামূলক কর্মূসচি পালন করা হচ্ছে। যেসব স্থানে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে সেসব স্থানে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। পাথর নিক্ষেপের কারণে মানুষের ক্ষতি, ট্রেনের ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে। পাথর নিক্ষেপের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে- সেটিও তুলে ধরা হচ্ছে। প্রায় অভিন্ন তথ্য দিয়ে রেলওয়ের চিফ কমান্ড্যান্ট (পশ্চিমাঞ্চল) আশাবুল ইসলাম জানিয়েছেন, পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বন্ধে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এতে কোনো শিশু যদি পাথর ছোড়ে সে জন্য ওই শিশুর অভিভাবককেও আইনের আওতায় আনার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ট্রেনে পাথর ছোড়ার দায়ে বিভিন্ন ধরনের দণ্ড দেওয়ার আইন রয়েছে। পাথর মারার অপরাধে ১০ হাজার টাকা জরিমানা থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আইন রয়েছে। আবার পাথর নিক্ষেপের ফলে কোনো যাত্রীর মৃত্যু ঘটলে মৃত্যুদণ্ডের আইনও রয়েছে। কিন্তু পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় জড়িতদের খুব একটা চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা যায় না। পাথর নিক্ষেপের দায়ে যাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই শিশু-কিশোর, টোকাই ও ভবঘুরে লোকজন। ফলে তাদের সহজে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া যাচ্ছে না।





মন্তব্য করুন