ভ্রমণপিপাসু ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী সাজ্জাদ খান রনিকে নিয়ে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে ঘুরছি। পাখি ও প্রজাপতি খুঁজে বেড়াচ্ছি এবং ওদের ছবি তুলতে তুলতে এক সময় অভয়ারণ্যের লেকের কাছে চলে এলাম। লেকে একঝাঁক সরালি হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছিল। সেখানে খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে পাশের টিলায় উঠলাম। এই টিলার গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে বিভিন্ন প্রজাতির বুলবুলি, বুনো পায়রা-ঘুঘু, সাত সাইলি, ছাতারে, টিয়া, ফিঙে, মাছরাঙা, বসন্তবউরি, প্যাঁচা, বাজ, কাঠঠোকরাসহ বহু ধরনের পাখির বাস। এ ছাড়া রয়েছে বন মুরগি, মথুরা, বন কোকিল, লাল ট্রোগন, ময়না ইত্যাদি। তাছাড়া শীতের পরিযায়ী পাখির তো অভাবই নেই। টিলা পথে হাঁটতে হাঁটতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও প্রজাপতির খোঁজ করছি। এমন সময় বড় একটি গাছের ডাল থেকে ব্রাশের মতো ঝুলতে থাকা বিশাল কিছু একটা চোখে পড়ল। একঝলক দেখেই চিনে ফেললাম ওটাকে এবং দ্রুত এগিয়ে গেলাম। গাছের কাছাকাছি আসার পর পুরো চেহারা দেখে রনি ওর ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। যদিও আমার কাছে ওর ছবির অভাব নেই, তবু গাছের ডালে বিশ্রামরত স্তন্যপায়ী প্রাণীটির দু-চারটা ছবি তুলে নিলাম। প্রাণীটিকে এর আগে কালেঙ্গা ছাড়াও কমলগঞ্জের সীমান্তবর্তী রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের আদমপুর বিটে দেখেছি। তথ্যমতে, বর্তমানে এই দুটি জায়গা ছাড়া সংকটাপন্ন এই প্রাণীটিকে বাংলাদেশের আর কোথাও দেখা যায় না। প্রাণীটিকে প্রথমবার দেখেছিলাম ১৯৮৭ সালে ঢাকা চিড়িয়াখানায় আবদ্ধ অবস্থায়। কিন্তু বুনো পরিবেশে প্রথম দেখি মালয়েশিয়ায় পিএইচডি করার সময় 'Taman Buaya Melaka' বা 'মেলাকা কুমির খামার'-এর একটি বড় গাছে। তবে জায়গাটা অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকায় ভালো ছবি তুলতে পারিনি।

এতক্ষণ বিরল ও সংকটাপন্ন যে স্তন্যপায়ী প্রাণীটির গল্প বললাম, সে এ দেশের বৃহত্তম কাঠবিড়ালি রাম কোটা, যার অর্থ বড় কাঠবিড়ালি। বৃহৎ কাঠবিড়ালি নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Black Giant Squirrel বা Malayan Giant Squirrel| Sciuridae গোত্রভুক্ত প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম Ratufa bicolor। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রাণীটির দেখা মেলে।

রাম কোটা লম্বায় এক মিটারের বেশি, যার মধ্যে মাথা ও দেহ মিলে ৪২ সেন্টিমিটার এবং লেজ ৬০ সেন্টিমিটার। ওজন প্রায় দুই কেজি। দেহের ওপরের লোমের রং গাঢ় বাদামি থেকে কালো। গাল, গলা, বুক-পেট ও চার হাত-পায়ের ভেতরের দিকটার লোম হালকা হলুদ বা সাদা। লম্বা ঝোপাল লেজটা কালো। কান দুটি বেশ বড় ও কালো; কানে গোছার মতো চুল থাকে। আগেই বলেছি, ওদের হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য ও রাজকান্দি সংরক্ষিত মিশ্র চিরসবুজ বন ছাড়া দেশের আর কোথাও দেখা যায়নি। তবে কারও কারও মতো চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনেও ওদের থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বৃক্ষবাসী প্রাণীটি সহজে মাটিতে নামে না। বেশ লাজুক এবং ভিতুও। দিনের বেলা সক্রিয় থাকে। সাধারণত একাকী থাকে, কখনওবা জোড়ায় দেখা যায়। উঁচু ও কাঁপা কাঁপা স্বরে 'চুড ... চুড ... চুড' শব্দে ডাকে। বিভিন্ন ধরনের ফল, পাতা, অঙ্কুর ও গাছের ছাল খায়। ফলের বীজ ছড়িয়ে বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। এ সময় ওরা বিভিন্ন গাছে একাধিক বাসা বানায়। পাতা ও ছোট ছোট কাঠি জড়ো করে বড় ও গোলগাল বাসা গড়ে। বাসার ভেতরে অন্দরমহলও থাকে। আর ঢোকার রাস্তা থাকে একপাশে। স্ত্রী রাম কোটা ৩২ দিন গর্ভধারণের পর প্রায় ৭৫ গ্রাম ওজন ও ২৩ সেন্টিমিটার লম্বা একটি বাচ্চার জন্ম দেয়; তবে কদাচ দুটি বাচ্চার জন্ম দিতে পারে। স্ত্রী বছরে দু'বার বাচ্চা দেয়। বাচ্চারা প্রায় তিন বছর বয়সে যৌবনপ্রাপ্ত হয়। বুনো পরিবেশে ওরা কত বছর বাঁচে তার কোনো তথ্য জানা না গেলেও আবদ্ধ অবস্থায় ১৯ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়েই দিনে দিনে ওদের সংখ্যা কমছে। বন ধ্বংসের কারণে আবাস এলাকা কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। বিরল রাম কোটা যেন এ দেশ থেকে হারিয়ে না যায় সে জন্য সরকার ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে বইয়ের পাতা ছাড়া আর কোথাও ওদের দেখা মিলবে না।

লেখক :অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

মন্তব্য করুন