চট্টগ্রামে এম এ মান্নান ফ্লাইওভারের (বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার) আরাকান সড়কমুখী র‌্যাম্পের একটি পিলারে ফাটল দেখা দিয়েছে। এ ছবি ফেসবুকে ছড়ালে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনা এড়াতে সোমবার রাত থেকে র‌্যাম্পটিতে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে পরিদর্শনে গিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং প্রধান প্রকৌশলীও বলেছেন, নির্মাণ ত্রুটির কারণেই ফাটল ধরেছে। যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন মেয়র। তবে ফ্লাইওভারটির নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দাবি, এটি ফাটল নয়; পিলারের জোড়া। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কারিগরি দল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে।

যানজট নিরসনে নগরের শুলকবহর থেকে বহদ্দারহাট, এক কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত এম এ মান্নান ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সিডিএ। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১২ সালের নভেম্বরে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসে ১৪ জন নিহত হন। এর পর নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্ব পায় সেনাবাহিনী। নির্মাণকাজ শেষে ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর ফ্লাইওভার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর ফ্লাইওভারটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চসিককে বুঝিয়ে দেয় সিডিএ।

উদ্বোধনের পর ফ্লাইওভারটি কার্যকর না হওয়ায় ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে আরাকান সড়কমুখী র‌্যাম্প নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সিডিএ। ৩২৬ মিটার দীর্ঘ এবং ৬ দশমিক ৭ মিটার প্রস্থ র‌্যাম্পটি নির্মাণ শেষে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। র‌্যাম্পটিতে ১৪টি পিলার রয়েছে। গত সোমবার এর একটি পিলারে ফাটলের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর ফ্লাইওভার এলাকায় শুরু হয় উৎসুক মানুষের আনাগোনা। রাতে র‌্যাম্পটিতে যান চলাচল বন্ধ করে দেন পুলিশ। তারা বিষয়টি সিডিএ এবং সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের জানান। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন স্থানীয় কাউন্সিলর এসরারুর হক। তিনিও মেয়রকে বিষয়টি জানান। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীদের নিয়ে

বহদ্দারহাটে যান মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। ফাটল দেখে তিনি হতবাক হয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, নির্মাণ ত্রুটির কারণেই পিলারে ফাটল ধরেছে।

ওই সময় চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামও বলেন, ত্রুটি অবশ্যই আছে। নয়তো ফাটল দেখা দিত না।

পিলারের ত্রুটি সংশোধনে সিডিএকে চিঠিও দিয়েছে চসিক। সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের হক মার্কেট সংলগ্ন দুইটি পিয়ারে সৃষ্ট ফাটলের কারণে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টিসহ যানবাহন চলাচলও বন্ধ রয়েছে। যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

ফ্লাইওভারটির প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমানও শুরুতে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে এ ফাটল দেখা দিতে পারে বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যায় তিনি সমকালকে বলেন, 'আমি মন্ত্রণালয়ের একটি সভায় অংশ নিতে ঢাকায় অবস্থান করছি। ঘটনাস্থলে একজন কনসালট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আছেন। তিনি জানিয়েছেন, এটি ফাটল না। এটি পিলারের সঙ্গে র‌্যাম্পের জোড়া। জোড়াতে ফোম ছিল। সেটি সরে গেছে। তাই নিচ থেকে দেখে মনে হচ্ছে, ফাটল। পিলার নির্মাণের পর থেকেই এটি ছিল। এর পরও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের (ডিপিএম কনসালট্যান্ট) কারিগরি দল আগামীকাল (বুধবার) আসবে। এ ছাড়া র‌্যাম্প নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সের প্রকৌশলীরাও বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছেন। তারা প্রতিবেদন দিলে বিস্তারিত জানা যাবে।'

এ প্রসঙ্গে জানতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

ফ্লাইওভারে ভারী যান চলাচল নিয়ে দ্বিমত :মূল ফ্লাইওভারে নকশায় র‌্যাম্প ছিল না। পরে ফ্লাইওভারটি কার্যকর করতে নির্মাণের চার বছর পর র‌্যাম্প যুক্ত করা হয়। র‌্যাম্পের নকশায় ভারী যানবাহন চলাচলের সুযোগ রাখা হয়নি বলে জানান প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, 'র‌্যাম্পের প্রবেশমুখে ভারী যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা (ক্রসবার) দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিচের সড়কে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সে প্রতিবন্ধকতা কে বা কারা খুলে দিয়েছিল। এর পর থেকে ভারী যানবাহন চলাচল করছে।' তবে র‌্যাম্পে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না বলে জানিয়েছেন সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী।





মন্তব্য করুন