আখিরা সেতুর এপারে বটেরহাট, ওপারে মাঝিপাড়া। মাঝিপাড়ার দ্বিতীয় বাড়িটি হলো অভয় দাসের। অভয়দের পুরোনো বাড়িটি পাড়ার আরেকটু ভেতরে। পুরোনো ওই বাড়িতেই তার অন্য পাঁচ ভাইয়ের বসত। ছয় ছেলে ও তিন মেয়ের মা (অভয়ের মা) ভৈরবী দাসী মারা গেলেন ১৬ অক্টোবর রাতে, বার্ধক্যজনিত কারণে। মায়ের শেষকৃত্য শেষ হতে না হতেই পরের দিন ১৭ অক্টোবর রাতে গ্রামে নেমে এলো আগুনের বিভীষিকা।

ওই রাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় এই মাঝিপাড়ার উত্তরাংশের ৩০টি ঘর। রাত সাড়ে ৯টার দিকে মাঝিদের উত্তরপাড়ায় আগুন দেওয়া হয় দক্ষিণপাড়ার ছেলে পরিতোষের নামে কাবা শরিফ অবমাননার অভিযোগ তুলে। অভয় দাস বলছিলেন, 'সেই দিনের কতা (কথা) সউগ (সব) সময় চোকের সামনোত ঘুরে বেড়াওছে (বেড়াচ্ছে)। মায়ের লাশ দাহ করি যে এংকা ঘটনা দেকপার নাগবে (দেখতে হবে), সেইটা স্বপনেও ভাবো নাই। দাউ দাউ করি আগুন জ্বলোছে গেরামত। ভয়ে থরথর করি হাত-পাও কাঁপা শুরু হইল। কী করিম মুই, ভাববা পারো নাই। একে তো মাও মারা যাওয়ার দুঃখ, তার ওপর বাড়িঘরে আগুন। ভেতরটা ফাটি যাওছে।'

অভয় দাসও মাঝিপাড়ার আর পাঁচজনের মতো মাছ ধরাকে প্রধান পেশা হিসেবে নিয়েছেন। তবে তিনি সেই সঙ্গে জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন। পুরোনো বাড়ি ছেড়ে এসে সেমিপাকা বাড়ি করেছেন। বাড়ির একটা ঘরে দিয়েছেন মুদি দোকান; অভয়ের ভাষায় 'গালামালের দোকান।' আগুনে বাড়ি-দোকান সবই পুড়েছে। একে তো মায়ের মৃত্যুর শোক, তার মধ্যে আগুনের তাণ্ডব তাকে হতবিহ্বল করে দিয়েছিল। অনেক ভয় পেয়েছিলেন অভয়। তবে ভয় থেকে অভয় মাঝে ফিরে আসছেন অভয় দাসরা। ছয় ছেলে ও তিন মেয়ের মা ভৈরবী দাসীর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন আত্মীয়-পরিজন সঙ্গে নিয়ে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে মঙ্গল আরতি দিয়ে শ্রাদ্ধের সূত্রপাত যেন মঙ্গলবার্তার প্রতীকে রূপান্তরিত হলো। এর পর ভোগ রান্না, পারলৌকিকের জন্য শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, নৃসিংহযজ্ঞ, ভোগারতি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান শেষ হলো বিকেল নাগাদ।

দিদার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যোগ দিতে কাল গাইবান্ধা থেকে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়ায় এসেছিলেন সুজিত কৃষ্ণ দাস। নিজেকে একজন কৃষ্ণভক্ত, ইসকন অনুসারী বলে পরিচয় দেন সুজিত। মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হওয়ার জন্য ইন্টার্নশিপ করছেন সাদুল্যাপুর হাসপাতালে। দিদা খুব অসুস্থ জেনে ১৬ অক্টোবরও সুজিতরা এসেছিলেন মাঝিপাড়ায়। মা ও বোনকে রেখে ফিরে যাওয়ার পর শুনতে পান, আগুনে জ্বলছে মামাদের সব কয়জনের বাড়ি। সুজিত বলছিলেন, 'সে যে কী উৎকণ্ঠার রাত ছিল আমাদের জন্য!' উৎকণ্ঠার গভীরতা বোঝানোর জন্যই ব্যাখ্যা করছিলেন- 'ধরেন, আপনি নিজেই কোনো বিপদের মধ্যে পড়লেন। তখন বিপদ থেকে মুক্তির চেষ্টা করবেন। কিন্তু আপনার

আপনজন কোনো বিপদের মধ্যে আছে- জানলেন; আপনি কিছুই করতে পারছেন না। মাঝিপাড়ায় আগুন দেওয়া হয়েছে- ফোনে এই খবর পাওয়ার পর কেমন অসহায় লাগছিল বলে বোঝাতে পারব না।'

অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন অভয়দের ছয় ভাইয়ের চতুর্থজন ভুলু দাসও। ভুলুর দেওয়া বিবরণ অনুসারে, ওই দিন দুপুরের পর পাশের শ্মশানে সৎকার করা হয় তাদের মাকে। পরিবারের সবাই যখন সৎকার অনুষ্ঠানে ব্যস্ত, ঠিক তখন শুনতে পান, আশপাশে মানুষ জড়ো হচ্ছে তাদের গ্রামে হামলা করবে বলে। প্রথম হামলা ও লুটপাট হয় সন্ধ্যার আগে আগে। পরে রাতে যখন আগুন দেওয়া হয়, তখন গ্রামসুদ্ধ সবাই পালিয়ে আশ্রয় নেয় ধানক্ষেতে।

এখনও মাঠজুড়ে ধানক্ষেতের সবুজ বিস্তার চোখ জুড়িয়ে দেয়। ধানক্ষেত থেকে নিজেদের তিনটি টিনশেড ঘর পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যেতে দেখলেন অভয় দাসের স্ত্রী লক্ষ্মী রানী। তিনি বলেন, 'ঘরোত মালপত্তর, চাইল-ডাইল, ট্যাকা-পাইসা সউগ কিছু নিয়া গেইছে হামলাকারী মানুষগুলা। যেগুলা নিব্যার পারে নাই, সেগুলা আগুনোত পুড়ি ছাই হয়া গেইছে। এমনি মা মরার দুঃখ, আর একদিকি ঘরবাড়ি আগুনোত পুড়ি যাওয়ায় পাথর হয়া গেইছে মোর স্বামী। মোর ছইল দুইটার দেকি ফিরি দেকপার পারছিনু ন্যা ওই দিন।'

অভয়ের মা ভৈরবী দাসীর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে ন্যাড়া মাথার একটি ছেলে বারবার ফিরে আসছিল আমাদের কাছে। কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু প্রশ্ন করলে উত্তর না দিয়ে চলে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে ছেলেটি একজন নারীকে টেনে নিয়ে এলো। ভদ্রমহিলার নাম সন্ধ্যা রানী দাস। তিনি প্রয়াত ভৈরবী দাসীর বড় ছেলে সন্তোষ দাসের স্ত্রী। সন্ধ্যা রানী জানালেন, কিশোরটি তার ছেলে শঙ্কর বাবু দাস। সেই রাতের পর থেকেই সে কিছু বলতে চাইছে। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় বলতে পারছে না। বাকপ্রতিবন্ধীরা একই সঙ্গে শ্রবণপ্রতিবন্ধীও হয়। কিন্তু সন্ধ্যার ধারণা, তার ছেলে শুনতে পায়। খুব ছোটবেলায় কথাও বলতে পারত।

সন্ধ্যা বলেন, 'বাড়ি ছাড়ি পালার সময় ছইলটাকে ডাকছিনু। কিন্তুক কিছুতেই বাইর করবার পারি নাই। পরে হামরা পালায়া গেইনু। কী ব্যা দেকছিলো, জানোছো না (কী যে দেখেছিল, জানতে পারছি না)। কবারও পারোছে না (বলতেও পারছে না)। কিন্তুক আইতোত (রাতে) ঘরোত যাইতে ভয় পায়। মনে করোচে, বুঝি ফির আগুন নাগবে। কোনোমতে ঘরোত নিবার পারলে মোর কোলোত সাথে নাগি নিন (কোল ঘেঁষে ঘুম) পাড়ে।'

মায়ের ডাকে ঘর ছেড়ে না পালানো ছেলে শঙ্কর এখন রাতে ঘরে যেতে ভয় পায়। কোনোমতে ওকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হলে ভয়ে কুঁকড়ে মায়ের কোলে ঘুমায়। এই ভয় তাড়ানোর জন্য সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার নানান রকম আয়োজন চলছে। তেমনি একটি সংগঠন টাঙ্গাইলের আর্ত সারথি গতকাল মাঝিপাড়ায় এসে ২৪টি পরিবারের হাতে নগদ দুই হাজার করে ৪৮ হাজার টাকা তুলে দিল। তবে সংগঠনটির সমন্বয়ক কৃষ্ণ কুমার কর্মকার জানালেন, তারা একটি সম্প্রীতি পাঠাগার করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিরোদা রাণী রায়ের মাধ্যমে গ্রামেরই একজনের হাতে আরও ৪২ হাজার টাকা দিয়েছেন। পাঠাগারের নাম হবে আর্ত সারথি সম্প্রীতি পাঠাগার। এখানে শুভানুধ্যায়ীদের অনুরোধ করা হবে বই দান করার জন্য।

মাঝিপাড়া থেকে ফেরার পথে পীরগঞ্জের ইউএনও বিরোদা রাণী রায়ের সঙ্গে দেখা হলো গ্রামের প্রথম বাড়িটিতে। ভবেশ দাসের বাড়ি সংস্কারের কাজ কেমন হচ্ছে, তা দেখছিলেন তিনি। 'মাঝিপাড়ার লোকজন ভয়ে গ্রাম ছেড়ে কাজের জন্য বের হচ্ছেন না'- আমাদের এমন জিজ্ঞাসায় ইউএনও রসিকতাচ্ছলে বললেন, 'আমার তো মনে হয়, এর সঙ্গে ত্রাণবঞ্চিত হওয়ার ভয়ও যুক্ত হয়েছে।' এর পর তিনি ভবেশের স্ত্রী কনকমালাকে ডেকে বললেন, 'তোমরা কি এখনও ভয় পাচ্ছ?' কনকের সরল উত্তর- 'ভয় কি কাটবে কোনোদিনও?'

ইউএনও বিরোদা রায়ও স্বীকার করলেন, কনকদের ভয় কাটার নয়। তিনি বলেন, 'বাড়ি পোড়ার ভয় কোনোদিনই কাটে না। আমরা সহমর্মিতা, সহযোগিতা দিয়ে চেষ্টা করছি মানুষগুলোকে ভয়ের ট্রমা থেকে বের করে আনতে। নির্ভয়ে যেন সবাই যে যার কাজে ফিরতে পারে- সেই চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছি।'





মন্তব্য করুন