চিরবন্ধু হিসেবে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে পরিচিত যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স অঘোষিত এক স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। সম্পর্কের শিথিলতা এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। পরস্পরের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগের তীর ছোড়া থেকে শুরু করে দ্বিপক্ষীয় ও ইউরোপীয় ইস্যুতে এক টেবিলে বসতে দেখা যাচ্ছে না দুই দেশকে। এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনেও।

লন্ডন ও প্যারিসের মধ্যে সম্পর্কের কেন এই অবনতি- সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে এই প্রশ্নের উত্তর। মূলত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া- এই তিন দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার জন্য যে চুক্তি করেছে, তার পর থেকেই দ্বন্দ্বের শুরু। চুক্তিটি 'অকাস চুক্তি' নামে পরিচিতি পেয়েছে। এর ফলে অভিবাসন, মৎস্য আহরণ, নৌ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল নিয়ে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে গিয়ে ২৭ অভিবাসন প্রত্যাশী মারা গেছেন। এ ঘটনার জন্য যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স পরস্পরকে দোষারোপ করছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে ইংলিশ চ্যানেল হয়ে ছোট ছোট নৌকায় হাজারো মানুষ ফ্রান্স থেকে যুক্তরাজ্যে গেছেন। এই অভিবাসন প্রত্যাশীদের ফিরিয়ে নিতে ফ্রান্সকে লেখা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের চিঠির ভাষ্যে ক্ষুব্ধ হয়েছে ফ্রান্স। এর জেরে গত রোববার ফ্রান্সের ক্যালেতে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেলের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করে দেন ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন।

ইংলিশ চ্যানেলে অভিবাসীদের হতাহতের ঘটনার পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোনকে চিঠি লেখেন বরিস জনসন। চিঠিতে ওই ঘটনাকে 'বেদনাদায়ক' উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে চ্যানেলের নিরাপত্তার জন্য ফ্রান্স-যুক্তরাজ্য যৌথ টহল চালু, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, অভিবাসন প্রত্যাশীদের ফ্রান্সে ফিরিয়ে নিতে দ্রুত একটি চুক্তি করাসহ বেশ কয়েকটি প্রস্তাবও দেন জনসন।

ইংলিশ চ্যানেলের সংকট নিয়ে ডারমানিন বলেন, চ্যানেল সংকট সমাধান করতে হলে প্রতিপক্ষ প্রীতি প্যাটেলসহ ব্রিটিশ মন্ত্রীদের প্রকাশ্যে তার দেশকে অপমান করে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। গার্ডিয়ানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ডারমানিন এর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, চ্যানেল সংকট নিয়ে যুক্তরাজ্যের 'দ্বৈত নীতি' বন্ধ করতে হবে। যুক্তরাজ্য ফ্রান্সের 'অধিপতি' নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ডারমানিনের বক্তব্যে স্নায়ুযুদ্ধের বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। কারণ, দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি এখন চোখে পড়ছে। এ বিষয়ে লন্ডনের কৌশলী আচরণে ক্ষুব্ধ প্যারিস। ডারমানিন বলেন, আমরা (ফ্রান্স-যুক্তরাজ্য) যখন একান্তে কথা বলি তখন সম্পর্ক ভালো থাকে। প্রতি সপ্তাহে আমি আমার প্রতিপক্ষের (ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলি। আমরা যখন ব্যক্তিগত বৈঠক করি ও বার্তা আদান-প্রদান করি, তখন দেখতে পাই যুক্তরাজ্যের ভিন্ন কিছু কৌশল রয়েছে। তখন আমাদের মধ্যে অল্প কিছু বিষয়ে মিল খুঁজে পাই।

তিনি বলেন, আমি আবার বলছি, যুক্তরাজ্যের কোনো সহায়ক সংস্থা নয় ফ্রান্স। আমরা গ্রেট ব্রিটেনের মতো মুক্ত ও স্বাধীন দেশ। আমরা চাই তারা মিত্র দেশের মতো আচরণ করুক।

এর আগে ফ্রান্সের একটি শরণার্থী শিবির উচ্ছেদ করা হয়েছে। ওই ক্যাম্পের বেশিরভাগই ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক, যারা পরে চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এরও আগে ফ্রান্সে থাকা ব্রিটিশ এসব নাগরিককে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানায় প্যারিস। অথচ তারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে অবস্থান করে আসছিলেন।

এর আগে ব্রেক্সিটের পর মাছ ধরার সীমানা নিয়ে উত্তেজনা বেড়েছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে। মাছ ধরার স্বত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যকার উত্তেজনা গত মে মাসে এতটাই তুঙ্গে উঠেছিল যে, যুক্তরাজ্য বিতর্কিত জলসীমায় যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল।

কয়েক দশক ধরে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে ফরাসি জেলেরা জার্সি দ্বীপের জলসীমায় মাছ ধরে আসছেন। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদের পর দেশটি সেখানে মাছ ধরার পরিমাণ বেঁধে দিয়ে ব্রিটিশ জলসীমায় ফ্রান্সের জেলেদের মাছ ধরার নতুন শর্ত কার্যকর করে। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। ব্রিটেনের বিরুদ্ধে ব্রেক্সিট চুক্তির বরখেলাপ করার অভিযোগ রয়েছে ফ্রান্সের কর্মকর্তাদের। প্যারিসের পক্ষ থেকে জার্সি দ্বীপের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকিও দেওয়া হয় সেই সময়। এরপরই ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করে যুক্তরাজ্য। পরে পাল্টা পদক্ষেপ নেয় ফ্রান্সও।

এরই মধ্যে ক্যালে দ্বীপে ওই সংকট সমাধানে মিত্রদের নিয়ে বৈঠক করে ফ্রান্স। যদিও ওই বৈঠকে লন্ডনকে আমন্ত্রণ জানায়নি প্যারিস।

১৫ সেপ্টেম্বর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও উন্নতি নিশ্চিত করা ও মূল্যবোধ সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার 'আদ্যাক্ষর নিয়ে' নতুন জোট অকাস গঠন করা হয়েছে। ওই ঘটনাকে পিঠে ছুরি মারার মতো পদক্ষেপ উল্লেখ করে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় প্যারিস। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন এক ভার্চুয়াল সম্মেলনে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই জোট ও স্বাক্ষরিত চুক্তির ব্যাপারে বিশ্বকে জানান। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের প্রভাব মোকাবিলার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ওই চুক্তিকে সামনে আনেন তারা। তবে এখানে অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থের চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সূদুরপ্রসারী কৌশলগত হিসাব-নিকাশ কাজ করছে। সেই হিসাব-নিকাশকে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এতটাই গুরুত্ব দিচ্ছে যে, তাদের ন্যাটো মিত্র ফ্রান্সকেও ক্ষেপিয়ে তুলতে দ্বিধা করেনি।

চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়াকে পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরির প্রযুক্তি দেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইউরোপ আর এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা একে বলছেন, এক মোড় বদলকারী ঘটনা, যা পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেবে। বিশ্বে বর্তমানে মাত্র ছয়টি দেশের হাতে পারমাণবিক সাবমেরিন আছে। দেশগুলো হলো- যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ভারত। পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন শত্রুপক্ষের চোখ এড়িয়ে গভীর সমুদ্রের নিচে মাসের পর মাস ডুবে থাকতে পারে এবং দ্রুত চলাচল করতে পারে। তার উপস্থিতি চিহ্নিত করাও অনেক কঠিন। এ ছাড়া এগুলো অনেক বেশি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে এবং তা অনেক বেশি দূর পর্যন্ত নিক্ষেপ করা যায়। সুতরাং পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের মালিক হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে।

ফ্রান্স-যুক্তরাজ্যের মধ্যে স্নায়ুদ্ধের সূত্রপাত এই অকাস চুক্তিকে ঘিরেই। এর আগে সম্পাদিত ফ্রান্সের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ১২টি সাবমেরিন তৈরি-সংক্রান্ত চুক্তি ছিল, যার আর্থিক মূল্য ছিল ৫০ বিলিয়ন ডলার। এখন অকাস চুক্তির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক শক্তি চালিত সাবমেরিন দেবে যুক্তরাষ্ট্র। স্বাভাবিকভাবেই দেশটি ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে। ফলে শত শত কোটি ইউরোর অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশটি।

বিষয়টি কোনো মতেই মেনে নিতে পারছে না প্যারিস। একে 'সত্যিকার অর্থেই পেছন থেকে ছুরিকাঘাত' বলে মন্তব্য করেছেন মাক্রোন। ফ্রান্স নিশ্চিতভাবেই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি করেছিল। কিন্তু অকাস চুক্তির মাধ্যমে সেই আস্থার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্র দেশগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়। ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ১৯৮০ দশকের শেষ পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ছিল। এ পরিস্থিতিকে সে সময় 'স্নায়ুযুদ্ধ' বা 'কোল্ড ওয়ার' নাম দেওয়া হয়। এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। সেই থেকে শুরু হওয়া স্নায়ুযুদ্ধ আজও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে চলমান রয়েছে। সর্বশেষ অকাস চুক্তি থেকে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে নতুন এই স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে।





মন্তব্য করুন