সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ কর্মসূচির আওতায় গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারাদেশে ২৪ লাখ ২৯ হাজার ৮৫৮ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬১ শতাংশ পুরুষ, নারী ৩৮ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর হার ১ শতাংশ। দেশের প্রতিবন্ধীপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে কুমিল্লা জেলা। সেখানে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৪.০৯ শতাংশ। অন্যদিকে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা সবচেয়ে কম বান্দরবান জেলায় শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ।

জরিপ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বান্দরবানের পাশাপাশি পার্বত্য অপর দুই জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এবং মুন্সীগঞ্জ ও মেহেরপুরেও প্রতিবন্ধিতার হার কম। এই পাঁচ জেলায় গড়ে প্রতিবন্ধিতার হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশের কম।

এদিকে বিভাগ হিসেবে রাজধানী ঢাকা এবারও প্রতিবন্ধিতার শীর্ষে অবস্থান করছে। তবে বিভাগীয় পর্যায়ে সর্বনিম্ন প্রতিবন্ধীপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সিলেট বিভাগ। প্রতিবন্ধিতার ১২টি ক্যাটাগরির মধ্যে সর্বোচ্চ শারীরিক প্রতিবন্ধী। প্রায় অর্ধেক মানুষ শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার। আর সর্বনিম্ন ডাউন সিনড্রোম প্রতিবন্ধী। মোট জনগোষ্ঠীর এক শতাংশের কিছু বেশি প্রতিবন্ধিতার শিকার বলে জরিপে উঠে এসেছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধিতা জরিপ কর্মসূচির পরিচালক অদ্বৈত কুমার রায় বলেন, বর্তমানে প্রতিবন্ধিতার শিকার ব্যক্তিরা অনলাইনে আবেদন করেন। যাচাই-বাছাই করে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে কী কারণে এলাকাভিত্তিক সংখ্যাগত তারতম্য রয়েছে, তা জানা যায়নি। তার ধারণা, এলাকাভিত্তিক জনসংখ্যা কমবেশি থাকায় সংখ্যায় পরিবর্তন হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকায় দেশের এক-দশমাংশ মানুষ বসবাস করলেও এটি এ তালিকার ছয় নম্বরে রয়েছে। এর কারণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি পরিচালক। বিষয়টি জানতে এ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

এ অবস্থায় আজ শুক্রবার পালিত হচ্ছে ৩০তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস ও ২৩তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় 'কোভিডোত্তর বিশ্বের টেকসই উন্নয়ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ'। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

শীর্ষে কুমিল্লা, সর্বনিম্ন বান্দরবানে : দেশের জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন কুমিল্লা জেলায়। এই হার ৪ .০৯ শতাংশ। এরপর পর্যায়ক্রমে ময়মনসিংহে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ, টাঙ্গাইলে ৩ দশমিক ১২ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ, গাইবান্ধায় ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ, ঢাকায় ২ দশমিক ৮১ শতাংশ, রংপুরে ২ দশমিক ৮০ শতাংশ, রাজশাহীতে ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, দিনাজপুরে ২ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং নওগাঁয় ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। আর সবচেয়ে কম প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন বান্দরবানে- শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ। এরপর পর্যায়ক্রমে রাঙামাটিতে শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ, মুন্সীগঞ্জে শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ, মেহেরপুরে শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং খাগড়াছড়ি শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন।

এদিকে শীর্ষে থাকা ঢাকা বিভাগে ৪ লাখ ৬২ হাজার ৭১১ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। এরপর পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রামে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৭১ জন, রাজশাহীতে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬৫ জন, রংপুরে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ১৩ জন, খুলনায় ৩ লাখ ৪২ হাজার ৫০ জন, ময়মনসিংহে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৩৩৫ জন, বরিশালে ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৮০ জন এবং সিলেট বিভাগে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯৭৩ জন শনাক্ত হয়েছেন।

প্রায় অর্ধেকই শারীরিক প্রতিবন্ধী : দেশে শনাক্ত মোট প্রতিবন্ধীর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার। এর মূল কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনাসহ অন্যান্য দুর্ঘটনার শিকার হয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়েছে ৪৮ দশমিক ১০ শতাংশ মানুষ। এরপর পর্যায়ক্রমে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতায় ১৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ, বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতায় ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতায় ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, বাকপ্রতিবন্ধিতায় ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ, সেরিব্রাল পালসিতে ৪ দশমিক ১ শতাংশ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতায় ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ, শ্রবণ প্রতিবন্ধিতায় ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ, অটিজমে ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, অন্যান্য প্রতিবন্ধিতায় শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ, শ্রবণদৃষ্টি প্রতিবন্ধিতায় শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ডাউন সিনড্রোমে সবচেয়ে কম শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত রয়েছে।

জাতীয় অর্থোপেডিক পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, নিটোরে প্রতিদিন গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ মানুষ বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে আসে। তাদের মধ্যে বড় অংশই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার।

শিক্ষা ও চিকিৎসা অধিকারে পিছিয়ে : প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ও অধিকার আইন এবং শিক্ষানীতিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষার সর্বস্তরে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হলেও তা আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, সরকারি বিদ্যালয়ে গড়ে ২১ এবং বেসরকারি বিদ্যালয় একজন করে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভর্তি আছে। বিদ্যালয় প্রতি গড়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের হার ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অটিস্টিক একাডেমি স্থাপন প্রকল্প চালুর পর বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ৫০ শিক্ষক রাজধানীর ৮৭ বিদ্যালয়ে জরিপ চালিয়ে এ তথ্য পান। অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় পূর্বাচলে ৩ দশমিক ৩১ একর জমির ওপর অটিস্টিক একাডেমি প্রতিষ্ঠার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ও অটিজমবিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত এমপি সমকালকে বলেন, প্রতিবন্ধী বিশেষ করে অটিস্টিক শিশুরা শিক্ষার দিক থেকে একটু পিছিয়ে থাকে। কিন্তু শুরুতেই স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গে মিশতে দিলে তাদের ভাষাগত দক্ষতা ও অস্বাভাবিকতা কিছুটা সংশোধন হবে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গে প্রতিবন্ধীদের বেশি করে একীভূত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

বিএসএমএমইউর ইপনা সেন্টার ছাড়া সরকারিভাবে প্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক কোনো চিকিৎসা কেন্দ্র নেই। এমনকি চিকিৎসকদেরও এ চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও সরকারি হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছেন। এ ছাড়া সাধারণ রোগীদের মতো তাদের লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা নিতে হয় না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সারাদেশের সরকারি হাসপাতালে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া আছে।

কর্মসূচি : কভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা নিয়ে এবার ভার্চুয়াল আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।





মন্তব্য করুন