বাবা বলেছিলেন, যেহেতু একা চলাফেরা করতে পারিস না, তাই বাইরে গিয়ে তোর লেখাপড়া করার দরকার নেই। বাবা এ কথা বলেছিলেন একমাত্র প্রতিবন্ধী মেয়ে বাইরে গেলে হয়তো পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে সে আশঙ্কা থেকে। কিন্তু সেই প্রতিবন্ধী মেয়েই একদিন ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া করবে এবং একজন সেরা উদ্যাক্তা হবে, তা কে জানত। সেই অদম্য মেধাবী মেয়েটির নাম জান্নাতুল ফেরদৌস মহুয়া। তিনি বগুড়া শহরের চকলোকমান খন্দকারপাড়া এলাকার মৃত আবদুল মজিদের মেয়ে।

মহুয়া জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী। তার দুই পা ও এক হাত অবশ। একা চলাফেরা করতে পারেন না। শিশুকাল থেকেই লেখাপড়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল মহুয়ার। কিন্তু বাবা চাইতেন না প্রতিবন্ধী মেয়েটি বাইরে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনায় পড়ূক। তিনি মহুয়াকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেও স্কুলে যেতে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। এ কারণে মহুয়া তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বাড়িতে পড়াশোনা করেছেন। এক পর্যায়ে মহুয়ার জেদের কারণে স্কুলে যেতে দিতে বাধ্য হন বাবা। স্কুলে যাতায়াত শুরুর পর থেকে প্রতিটি ক্লাসে পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন তিনি। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় তার মা তাকে হুইলচেয়ার ঠেলে প্রতিদিন নিয়ে যেতেন, নিয়ে আসতেন।

স্থানীয় ফয়জুল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন মহুয়া। এরপর বগুড়া সরকারি শাহ সুলতান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর একই কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স শেষ করে এখন মাস্টার্সে পড়ছেন।

মহুয়া ২০১৭ সালে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়াকালে নিজের হাত খরচ চালানোর জন্য থ্রিপিসে সেলাইয়ের ফোঁড় তুলতে শুরু করেন। এরপর ২০১৮ সালে ফেসবুকের মাধ্যমে অনলাইনে শুরু করেন নিজের হাতের কাজ করা শাড়ি, থ্রিপিস বিক্রি। সে সময় তিনি একা হলেও বর্তমানে তার সঙ্গে আরও ৩৫ নারী কাজ করছেন। এই নারীদের তিনি নিজেই কাজ শিখিয়েছেন। কাজ শেখার পর তারা কাজ নিয়ে বাড়িতে বসে সেলাই করেন।

মহুয়ার সঙ্গে কাজ করা একজন নারী একটি থ্রিপিস সেলাই করে মজুরি পান ৩৫০-৪০০ টাকা, শাড়িতে কাজ করে পান ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা। কাজ করা এসব থ্রিপিস মহুয়া বিক্রি করেন এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায় এবং শাড়ি দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকায়।

প্রতি মাসে মহুয়ার ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকার মতো শাড়ি, থ্রিপিসসহ অন্যান্য পণ্য বিক্রি হয়। তবে উৎসব এলে তার বিক্রি লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০১৮ সাল থেকেই তিনি হাতের কাজ করা শাড়ি, থ্রিপিস মূলত বিক্রি করেন ফেসবুকের মাধ্যমে। ফেসবুকে তার 'জধরহনড়-িরংধনু' নামে একটি পেজ আছে। এই পেজে গেলেই তার পণ্যের ছবি ও বিস্তারিত পাওয়া যাবে।

মহুয়ার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান অনলাইন ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'উমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম' (উই)-এর। ফেসবুকের 'উই' গ্রুপের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের আরও ১৭টি দেশের প্রবাসী বাংলাদেশি এবং সেখানকার স্থানীয়দের কাছে পণ্য বিক্রি করেছেন মহুয়া। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডা, জার্মানি, মালয়েশিয়া ও দুবাই। গত ছয় মাসে ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন মহুয়া উই গ্রুপের মাধ্যমে।

মহুয়া জানান, তার নিজের বাড়ি বগুড়া শহরে হলেও তিনি বর্তমানে শেরপুরের ছোনকা বাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় মাকে নিয়ে থাকেন। সেখানকার নারীদের দিয়েই তিনি শাড়ি, থ্রিপিসে সেলাইয়ের কাজ করিয়ে নেন। ভবিষ্যতে ছোনকা বাজারেই কারখানা দেওয়ার ইচ্ছা আছে তার। ঢাকাতে একটি শোরুমও দিতে চান তিনি।







মন্তব্য করুন