পাহাড়, মেঘ, নদীর জল ও সবুজ মিলেমিশে একাকার সেখানে। মেঘের আনাগোনার মধ্যেও স্বচ্ছ পুরো আকাশ। যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা স্বপ্নের এক গ্রাম। বান্দরবানের রুমা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি পথে কেওক্রাডং ও বগা লেকে যাওয়ার পথে হঠাৎ চোখ জুড়িয়ে যাবে অনিন্দ্যসুন্দর এই গ্রাম দেখে, যার নাম মুনলাইপাড়া। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বম সম্প্রদায়ের ৬৯টি পরিবারের বসবাস সেখানে। তাই বমপাড়া হিসেবেও পরিচিত এই গ্রাম।

এখানে পিচঢালা সড়কের দু'পাশে ছোট ছোট গোছালো মাচার ওপর আধা-পাকা কাঠের তৈরি বাড়িগুলো যেন একেকটি স্বপ্নকুটির। প্রতিটি বাড়ির সামনেই দেশি-বিদেশি নানা ধরনের ফুলের বাগান। কান জুড়িয়ে যায় পাখির কিচিরমিচির ও মায়াবী ডাকে। পাড়ার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ছোট ছোট ঝুড়ি। ছোট-বড় সবাই সেগুলোতেই ময়লা ফেলেন। মুনলাইপাড়া এতই পরিচ্ছন্ন যে, কোনো সড়কে গাছের মরা পাতা খুঁজে পেতেও হিমশিম খেতে হয়।

গত বছর বান্দরবানের এই মুনলাইপাড়া তিন পার্বত্য এলাকার মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন পরিষদ থেকে এ স্বীকৃতি অর্জনের পর এবার বিশ্ব আসরে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছে মুনলাই। এবারই প্রথম জাতিসংঘ থেকে 'বেস্ট ট্যুরিজম ভিলেজেস অব দ্য ওয়ার্ল্ড' নামে একটি প্রতিযোগিতা হতে চলেছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন থেকে যে তিনটি গ্রাম এই প্রতিযোগিতার জন্য মনোনীত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বমদের মুনলাইপাড়া।

সম্প্রতি সরেজমিনে মুনলাই গিয়ে দেখা গেল, পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে গ্রামে প্রবেশের আগেই ছোট্ট একটি সাইনবোর্ডে লেখা- 'সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামে আপনাকে স্বাগত'। গ্রামে ঢোকার পথে যেসব বম নারী-পুরুষের দেখা মিলল, তাদের মুখচ্ছবি যেন বলছে- তাদের চেয়ে সুখী আর কেউ নেই। সবার মুখে সুন্দর স্মিত হাসি, পরনে বমদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক।

বমপাড়াতেই কথা হলো জিংনেম বোমের (৬৫) সঙ্গে। বাড়ির আঙিনায় ছোট্ট ফুটফুটে নাতনিকে নিয়ে খেলাধুলায় ব্যস্ত তিনি। জিংনেম বললেন, বমদের ঐতিহ্য আমরা ধরে রেখেছি।

সব মিলিয়ে পার্বত্য এলাকায় মাত্র ১০-১৫ হাজার বমের বাস। তার মধ্যে মুনলাইপাড়ায় রয়েছে ৬৯ পরিবারে ৩০০ জন। ১৯৮১ সালে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে মুনলাইপাড়ায় বসতি গড়ে এই পরিবারগুলো।

কেন মুনলাইপাড়া একটি আদর্শ গ্রাম? কারণ হিসেবে জিংনেম বলেন, এই পাড়ার কোনো ঘরে একটিও তালা-চাবি নেই। তালা-চাবি কেনার কথা কেউ কল্পনাও করে না। ১৯৮১ সালে মুনলাইপাড়া প্রতিষ্ঠার পর গ্রামে একটি চুরির ঘটনা ঘটেনি আজও। একেকটি পরিবার প্রতিটি পরিবারের পাহারাদার। মুনলাই থেকে কোনো বম পরিবার অন্য কোনো বমপাড়ায় বেড়াতে গেলে প্রতিবেশীরা তার ঘর দেখেশুনে রাখেন। কোনো প্রতিবেশীর ঘরে হঠাৎ খাবার বা অন্য কোনো জিনিসপত্রের প্রয়োজন হলে প্রতিবেশীরাই এগিয়ে যান। আলাদা আলাদা ঘর থাকলেও তাদের সবার বাড়িই যেন সবার আঙিনা।

বমপাড়ার তরুণ অনুপম। তিনি পড়াশোনা করছেন চট্টগ্রাম ডিগ্রি কলেজে। অনুপম জানালেন, মুনলাইপাড়ায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাতজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষার হারও অনেক বেশি। গ্রাম পরিচ্ছন্ন রাখাসহ সার্বিক বিষয় দেখভালের জন্য একটি পাড়া কমিটি রয়েছে। পাড়ার প্রধানকে বলা হয় 'কারবারি'। এই গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে সুন্দর গোছানো 'মুনলাই সেন্টার ও পাঠাগার'। মুনলাই সেন্টারে মাঝেমধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে বমরা। তাদের নাচ-গান বিমোহিত করে পর্যটকদের। তাদের জনপ্রিয় নৃত্য 'বাঁশনৃত্য'।

অনুপম জানালেন, মুনলাইপাড়ার প্রতিটি পরিবারের রয়েছে তিন থেকে পাঁচ একর জমি। শুধু জুম চাষ নয়; কাজু বাদাম, আম, আনারস ছাড়াও নানা ধরনের ফল চাষ করে আয়-উপার্জন করেন তারা। এর সঙ্গে বমদের বাড়তি আয়ের পথ দেখাচ্ছে 'কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম'। বমদের কোনো কোনো পরিবার তাদের বাড়িতেই সুন্দর অতিথিশালা নির্মাণ করেছে। কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজমের ধারণা থেকে এসব তৈরি করেছেন তারা। এ উদ্যোগে প্রায় চার বছর ধরে তাদের সহায়তা দিচ্ছে বেজ ক্যাম্প অ্যাডভেঞ্চার লিমিটেড ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড।

পর্যটকদের জন্য বমদের তৈরি করা ঘরগুলোয় রয়েছে কাঠের মেঝের ওপর বিছানা পাতা। রয়েছে আধুনিক সুবিধার স্নানঘর। ব্যবস্থা রয়েছে বিদ্যুতের। তবে পর্যটকদের এ ঘরগুলো এমনভাবে তৈরি, ফ্যান না থাকলেও কিছু আসে যায় না। মুনলাইপাড়ার খাবারের বৈশিষ্ট্য হলো, কোনোটির উপাদানই ফ্রিজে রাখা হয় না। প্রতিদিন গ্রামের হাট থেকে খাবার বা রান্নার উপকরণ কিনে তৈরি করেন খাবারদাবার। ভাড়া বা খরচ হিসেবে পর্যটকদের দেওয়া টাকার একটা ভাগ পায় বমরা, আরেকটি ভাগ পায় গাজীপুরের রিসোর্ট বেজক্যাম্প বাংলাদেশ লিমিটেড। পর্যটকদের জন্য স্থানীয় নদী ও খালে কায়াকিং, ট্র্যাকিং ও নানা ধরনের খেলাধুলার ব্যবস্থাও রয়েছে।

বম নারী অনেকে কাপড় বোনেন। ঝুড়ি এবং উলের শালও তৈরি করেন। পাড়ায় এসব কাপড় বিক্রি করে মুনলাই কমিউনিটি ট্যুরিজম। কাপড় বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে মুনলাইয়ে শিশুদের একটি স্কুল চালায় তারা।

মুনলাইপাড়ায় একমাত্র বাঙালি শাহরিয়াজ আলম। তিনি 'মুনলাই কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম'-এর সমন্বয়কারী। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে আর্কিটেকচারে পড়াশোনা করে মুনলাইয়ে ওই চাকরি নিয়ে পাহাড়ে বসতি তার। শাহরিয়াজ বললেন, এ গ্রাম পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও আদর্শ গ্রাম। প্রতি মাসে গড়ে এখানে ৬০-৭০ জন পর্যটক থাকার জন্য আসেন। ২-৪ দিন পরিবার-পরিজন নিয়ে রাত্রি যাপন করে অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা বাড়ি ফেরেন। যারা একবার এসেছেন, মুনলাইয়ের প্রেমে তারা বারবার আসেন।

বেজ ক্যাম্প অ্যাডভেঞ্চার লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা তামজিদ সিদ্দিক স্পন্দন সমকালকে বলেন, কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজমের জন্য মুনলাইপাড়াকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এ থেকে যা আয় হয়, তার অর্ধেক বমরা পায়।





মন্তব্য করুন