ছয় বছর বয়সী সাকিরা আক্তার বৃষ্টি ঘুম থেকে জেগেই জানতে চাইছে- মা কোথায়, বাবা কোথায়? এমন অসহায় পরিস্থিতিতে তাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন স্বজনরা। 'মা নানির কাছে, বাবা অফিসে'- এমন তথ্য জানিয়ে তারা তাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এর পরও মায়ের দেখা পেতে নানির কাছে যেতে চাইছে সে। না পেরে জুড়ে দেয় কান্না। হাসপাতালের বিছানায় মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ মোড়ানো বৃষ্টি কাঁদতেই থাকে। একপর্যায়ে স্বজনরাও তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার আর ভাষা খুঁজে পান না। আড়ালে নিজেরাও চোখের পানি মোছেন।

ছোট্ট বৃষ্টিকে এখনও জানানো হয়নি, বাসের ধাক্কায় সে চিরতরে হারিয়েছে তার প্রিয় বাবা-মা ও নানাকে।

বৃষ্টির নানি সাহেদা বেগম রাজধানীর মহাখালীতে ক্যান্সার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাবা-মা ও নানার সঙ্গে সে গ্রামের বাড়ি বরিশালের উজিরপুর থেকে নানিকে দেখতে লঞ্চে শুক্রবার ভোরে ঢাকার সদরঘাটে আসে। সেখান থেকে অটোরিকশায় যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলে মামার বাসায় যাওয়ার সময় বাসের চাপায় নিহত হন বৃষ্টির বাবা রিয়াজুল ইসলাম, মা শারমিন আক্তার আর নানা আবদুর রহমান বেপারী। বেঁচে যাওয়া বৃষ্টির চিকিৎসা চলছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগের শিশু ওয়ার্ডে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাবা-মা হারানো শিশুটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনামূল্যে সব চিকিৎসার সুযোগ করে দিয়েছে।

ওই তিনজনকে দাফন করতে গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন বৃষ্টির দুই মামাসহ সব স্বজন। হাসপাতালে মেয়েটিকে দেখাশোনা করছে তার ছোট মামি সোনিয়া পারভীন মণি। তিনি বলেন, মেয়েটা ক্ষণে ক্ষণেই কেঁদে উঠছে, কথা বলছে। বাবা-মাকে খুঁজছে। তাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ক্যান্সার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার শাশুড়িকে (বৃষ্টির নানি) এখন পর্যন্ত এত বড় দুর্ঘটনার কথা জানানো হয়নি।

শনিবার হাসপাতালের বিছানায় বসেই কথা হয় বৃষ্টির সঙ্গে। ভাঙা ভাঙা শব্দে বলছিল, 'মা আসে না কেন? মায়ের কাছে যাব।' পরক্ষণেই খুঁজতে থাকে নিজের প্রিয় লাল জুতা। বলতে থাকে, 'আমার জুতা কোথায়?' এর পরই কান্না জুড়ে দেয়। তখন মামি সোনিয়া পারভীন সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, জুতা তোমার মায়ের ব্যাগে রয়েছে। তোমার মামা নিয়ে আসবে।

সোনিয়া পারভীন সমকালকে বলেন, অটোরিকশাকে চাপা দেওয়ার পর ব্যাগ বা জুতার কিছুই তারা পাননি। বৃষ্টির জুতা হয়তো রাস্তাতেই হারিয়ে গেছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বৃষ্টির অবস্থা অনেকটা ভালোর দিকে। তবে শিশু হওয়ায় অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে তার মাথার সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। এ রিপোর্ট পাওয়ার পর বিস্তারিত বোঝা যাবে।

এক স্বজন জানান, গতকাল সকালে বরিশালের বাবুগঞ্জের চরফতেহপুর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে বৃষ্টির বাবা-মায়ের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। দুপুরের দিকে উজিরপুরের মশাং গ্রামে তার নানার দাফন সম্পন্ন হয়।

র‌্যাব-১০-এর উপ-অধিনায়ক মেজর শাহরিয়ার জিয়াউর রহমান জানান, গতকাল অভিযুক্ত বাসের চালক দেলোয়ার হোসেন দিনারকে মানিকগঞ্জ থেকে এবং হেলপারকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা ওই দুর্ঘটনার কথা স্বীকার করেছে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, বাসটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। তা ছাড়া চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদও ছিল না।

মন্তব্য করুন