আসছে জুনে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু। ঢাকা মেট্রোরেলের একটি বড় অংশও খুলে দেওয়া হবে ডিসেম্বরের মধ্যে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলটি খুলে দেওয়া হবে একই সময়সীমায়। প্রকল্প তিনটির অগ্রগতি বিশ্নেষণ করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের নির্মাণকাজ এখন শেষ পর্যায়ে। করোনার প্রথম দিকে অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের মতো এ প্রকল্পগুলোরও নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়। তবে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দিন-রাত কাজ করা হচ্ছে।

প্রকল্প তিনটির মধ্যে কর্ণফুলী টানেল ছাড়া বাকি দুটি ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প। ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত প্রকল্প নির্মাণকাজ শুরু এবং শেষ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন তদারক ও সমন্বয় করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সাধারণত, প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি এবং মানসংক্রান্ত মূল্যায়নের দায়িত্ব পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি)। আইএমইডি এখন এসব প্রকল্পের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে সহযোগিতা দিচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর অবকাঠামো খাতে ১৪টি মেগা প্রকল্প হাতে নেয়। আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বিশেষ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে ৮টি প্রকল্পকে ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত করা হয়। আইএমইডির সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, পদ্মা সেতু এবং ঢাকা মেট্রোরেলের বাইরে অন্য প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। সরকার গুরুত্ব দেওয়ার পরও কেন ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের অগ্রগতি কম, তা নিয়ে গত সোমবার বৈঠক করেছে আইএমইডি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাস্তবায়ন এগিয়ে নিতে প্রকল্পগুলো পরিদর্শন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বৈঠকে।

বড় তিন অবকাঠামো প্রকল্প খুলে দেওয়া প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সমকালকে বলেন, জুনে পদ্মা সেতু উম্মুক্ত করে দেওয়া হবে। গেল ডিসেম্বরেই মেট্রোরেলের একটি অংশ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে করোনার কারণে সূচিমতো কাজ শেষ করা যায়নি। অনেক বিদেশি প্রকৌশলীও প্রকল্পটিতে কাজ করেন। তবে বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনায় তারা দেখেছেন, মেট্রোরেল আসছে বিজয় দিবসে খুলে দেওয়া যাবে। মেগা প্রকল্পের মধ্যে কর্ণফুলী টানেলও খুলে দেওয়া হবে এ বছর। দিন-রাত কাজ করে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সরকার আশা করছে, এই তিন প্রকল্প বাড়তি যে সেবা সংযোজন করবে, তাতে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়বে অতিরিক্ত ২ শতাংশ। উন্নয়ন বিশ্নেষকদের মতামতও একই রকম। এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর সমকালকে বলেন, বড় বড় প্রকল্পগুলো জনগণ ব্যবহারের সুযোগ পেলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বারবার সময় না বাড়িয়ে যথাসময়েই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল। এতে নির্মাণ ব্যয় যেমন নিয়ন্ত্রণে থাকত, জনগণও আগেই সেবা সুবিধা পেতে পারত।

সমাপ্ত ডিসেম্বর পর্যন্ত ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত প্রকল্পের বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, পদ্মা বহুমুখী প্রকল্পের মূল সেতুর কাজ প্রায় শেষ। সমাপ্ত ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সেতুর ৯৬ শতাংশ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। দিন-রাত কাজ করছেন দেশি-বিদেশি প্রকৌশলী, শ্রমিক ও কর্মকর্তারা। প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'আসছে জুনের মধ্যেই সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে। সরকারকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, ২০২২ সালের জুনের মধ্যে মূল সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করব। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জুনের মধ্যেই সরকারকে সেতুটি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত।'

জানা গেছে, জুনে মূল সেতু খুলে দেওয়া হলেও প্রকল্পের আনুষঙ্গিক কাজ শেষ হবে ২০২৩ সালের জুনে। অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড বা নির্মাণ শেষে কোনো ত্রুটি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতার জন্য অতিরিক্ত এক বছর হাতে রাখা হয়েছে।

ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট মেট্রোরেল আগামী বিজয় দিবসে উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশ খুলে দেওয়া হবে। প্রকল্পের এই দৈর্ঘ্যে মোট ৯টি স্টেশন রয়েছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে ৭৭ শতাংশেরও বেশি। ২০১২ সালে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এক হাজার ৭৬৫ কোটি টাকার প্রকল্পটিতে গেল ডিসেম্বর নাগাদ ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। এই প্রকল্পটি রাজধানীর যানজট নিরসনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আগামী ডিসেম্বরে খুলে দেওয়া হচ্ছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে কর্নফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত টানেলটি নগরীর পতেঙ্গা ও দক্ষিণের আনোয়ারা প্রান্তকে সংযুক্ত করবে। এতে ৪০ কিলোমিটারের পথ সাশ্রয় হবে। স্থানীয় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এই টানেল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

প্রকল্প অফিস সূত্রে জানা গেছে, গেল ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্মাণ অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ। করোনার প্রথম ধাক্কায় প্রকল্পের কাজ কিছুটা বিঘ্নিত হয়। চীনা প্রকৌশলীদের অনেকে ছুটিতে দেশে গিয়ে আটকা পড়ায় কাজের অগ্রগতি কিছুটা কম হয়েছে। ২২৫ জন চীনা নাগরিক প্রকল্পটিতে কাজ করছেন। কর্ণফুলী টানেল ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত প্রকল্প না হলেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, নির্ধারিত মেয়াদ আসছে ডিসেম্বরের আগেই প্রকল্প পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে। সে সব কাজ চলছে।

ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত বাকি ছয় প্রকল্প হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের রামু হয়ে বান্দরবানের ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমাপ্ত ডিসেম্বর পর্যন্ত গত ৫ বছরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অগ্রগতি মাত্র ৪১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় এক লাখ ১৩ হাজার ২২ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে এ প্রকল্পের নির্মাণ শুরু হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অগ্রগতি ৫২ শতাংশেরও কম। ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকার প্রকল্পটিতে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ হয়েছে প্রায় ৭৪ শতাংশ। কক্সবাজারে মহেশখালীর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের অগ্রগতি মাত্র ৩৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকার প্রকল্পটির এ পর্যন্ত ব্যয় ১৯ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। তবে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের রামু হয়ে বান্দরবানের ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প। আগামী জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। অথচ ১১ বছরে অগ্রগতি ৩৫ শতাংশেরও কম। আইএমইডি বলেছে, ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত জাতীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যে ধরনের গতি থাকা প্রয়োজন, তা কার্যত নেই এই প্রকল্পগুলোতে।

মন্তব্য করুন