বগুড়া মেডিকেলে ৫৬ ভাগ সরঞ্জামই নষ্ট

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪      

মোহন আখন্দ, বগুড়া ব্যুরো

বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামের ৫৬ শতাংশই নষ্ট। অত্যাধুনিক সরঞ্জামগুলো মাসের পর মাস নষ্ট হয়ে পড়ে থাকায় ৫০০ শয্যার হাসপাতালটির চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে হাসপাতালটিতে প্রতিদিন শয্যা সংখ্যার দেড় থেকে দুই গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নষ্ট সরঞ্জামগুলো মেরামতের জন্য একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইলেকট্রো ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপকে (নিমিউ) বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরঞ্জামগুলো কবে নাগাদ মেরামত হবে কিংবা ভবিষ্যতে আদৌ সচল হবে কি-না, নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কর্মকর্তারা জানান, শজিমেক হাসপাতালের বার্ষিক রাজস্ব আয় ৩ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে কিছু সরঞ্জাম মেরামতে তাদের আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে; কিন্তু মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না থাকায় কর্তৃপক্ষের হাত গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া কিছুই করার নেই।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নষ্ট সরঞ্জামগুলো দীর্ঘদিনেও মেরামত না হওয়ায় তারা প্রতিনিয়ত রোগীদের রোষানলে পড়ছেন। কারণ, রোগীরা মনে করছেন, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিকদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার জন্যই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো মেরামত না করে ফেলে রেখেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ৩১ আগস্ট চালু হওয়া এ হাসপাতালে রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ১৫৯টি সরঞ্জাম আনা হয়। সরঞ্জামগুলো উদ্বোধনের দিন থেকে চালু হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় দেড় থেকে দু'বছর পর্যায়ক্রমে চালু হয়। পরে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় অত্যধিক ব্যবহারে কয়েকটি সরঞ্জাম দ্রুত নষ্ট হতে থাকে। এভাবে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৮৯টি অর্থাৎ মোট সরঞ্জামের ৫৬ শতাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম হলো_ স্তন ক্যান্সার নির্ণয়ে ব্যবহৃত মেমোগ্রাফি মেশিন, ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহৃত লাইনার এক্সিলিরেটর মেশিন, কিডনির পাথর ক্রাশ করার কাজে ব্যবহৃত ইএসডবি্লউএল মেশিন ও সিটি স্ক্যান মেশিন। এ ছাড়া ৪টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে ৩টি, কার্ডিওলজি বিভাগের ৮টি ডেফিব্রিল্যাটর উইথ মনিটর ইসিজি মেশিনের মধ্যে ৫টি, এমআরআই মেশিনের অ্যাবসরভার, ল্যাপারোস্কপি মেশিন, চর্ম ও যৌন বিভাগের আলট্রাভায়োলেট লাইট সিস্টেম নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, অপারেশনের রোগীদের অজ্ঞান করার জন্য থাকা ২৯টি অ্যানেসথেসিয়া মেশিনের মধ্যে ১২টি আড়াই বছর ধরে নষ্ট। প্রায় একই সময় ধরে নষ্ট চিকিৎসা সরঞ্জামাদি জীবাণুমুক্তকরণের জন্য ব্যবহৃত ৬টি অটোক্লেভ মেশিন। কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুদের চিকিৎসার জন্য যে ৮টি বেবি ইনকিউবেটর মেশিন কেনা হয়েছিল, তার সব ক'টি দুই বছর ধরে অকেজো। প্রায় একই সময় ধরে অকেজো ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত সেল সেপারেটর মেশিন। নষ্ট হয়ে আছে এক্স-রে ফিল্ম ড্রায়ার, অটো ফিল্ম প্রসেসর, অটোমেটিক হেমাটোলজি অ্যানালাইজার। প্যাথলজি বিভাগে ১৫টি বাইনোকুলার ইলেকট্রিক মাইক্রোস্কোপের আটটিই নষ্ট। অকেজো হয়ে গেছে অত্যাধুনিক একমাত্র এক্স-রে (১০০০ এমএ) মেশিনটিও। ৬টি অপারেশন টেবিলও ব্যবহার অনুপযোগী।
শজিমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল পাশা জানান, সরঞ্জামগুলো মেরামতের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইলেকট্রো ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপকে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবেও যোগাযোগ করা হয়েছে; কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। সর্বশেষ ১৩ জুলাই হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে; কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। তিনি বলেন, 'এত অধিকসংখ্যক সরঞ্জাম দিনের পর দিন অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। যা নিমিউ কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করতে পারছেন কি-না আমাদের জানা নেই।'
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও বিএমএ বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি ডা. মোস্তফা আলম নান্নু জানান, নষ্ট সরঞ্জামগুলো মেরামতের জন্য তারা সাংগঠনিকভাবে যোগাযোগ রাখছেন।
শজিমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও বগুড়া-১ আসনের সাংসদ আবদুল মান্নান জানান, নষ্ট সরঞ্জামগুলো দ্রুত মেরামতের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কয়েকবার কথা বলেছি, তারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন। আশা করি খুব দ্রুত সরঞ্জামগুলো মেরামত করা সম্ভব হবে।'