নেশায় আচ্ছন্ন ক্যাম্পাস হাতে হাতে 'বাবা'

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

সাইফুল ইসলাম রাজ, ইবি

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা আশঙ্কাজনক হারে মাদক সেবনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ক্যাম্পাসে হাত বাড়ালেই মিলছে মদ, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা ও ইয়াবা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র হলগুলোতে মাদক সেবনের ধুম পড়ে। 'বাবা' নামে চলছে ইয়াবা সেবন। ছাত্রদের পাশাপাশি মেয়েরাও ইয়াবাতে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। অনেকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এখন হাতে হাতে ইয়াবা পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করলেও দোষীরা দৃশ্যমান শাস্তি না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদক সেবনের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। জানা গেছে, বিশ্ববিদালয়ে ইয়াবা কেনাবেচা ও সেবনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগতরা জড়িত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যত্রতত্র মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা পাওয়া যাচ্ছে। রাত হলেই ক্যাম্পাসের মফিজ লেক, জিমনেশিয়ামের পেছন সংলগ্ন জায়গা, খেলার মাঠ, টিএসসিসি, শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ ও ছাত্র হলগুলোর ছাদে ও বিভিন্ন রুমে মাদক সেবনের আখড়া বসে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও জিয়াউর রহমান হলের একটি অংশে মাদক সেবন অনেকটা ওপেন সিক্রেট।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন একাধিক দোকান ও মেস, ক্যাম্পাস সংলগ্ন শেখপাড়া বাজার, বঙ্গবন্ধু হল প্রাচীর সংলগ্ন কিছু বাসাবাড়িতে মাদকের আস্তানা গড়ে উঠেছে। অবাধে বিক্রি হচ্ছে ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা, মদ ও গাঁজা। এসব আস্তানা গড়ে ওঠার পেছনে হাত রয়েছে বিশ্বাবিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী ও বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন স্থানীয় বহিরাগতরা। একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ঢাকার বাইরে থেকে, ঝিনাইদহের মহেশপুর, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, কুষ্টিয়ার মিরপুর এবং যশোর থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে আসে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা। ইবি শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার আশ্রয়ে সাতক্ষীরা ও কক্সবাজার থেকে আসে ইয়াবা। তা ভাগাভাগি হয় ক্যাম্পাসেই। এখান থেকেই ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও আশপাশের এলাকায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি ক্যাম্পাসে স্থানীয় বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। এসব বহিরাগতদের মাধ্যমে কৌশলে ক্যাম্পাসে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য সরবরাহ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে তারা জানান। এ ছাড়া আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বেশ কয়েকজন ক্যাম্পাসে মাদকদ্রব্য সরবরাহ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অনুষদ ভবন সংলগ্ন একটি দোকানসহ ক্যাম্পাসের কয়েকটি চলমান হোটেলে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য সরবরাহ করেন। পরে এদের মাধ্যমে হাতবদল হয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে আসে। সূত্রমতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এমন কিছু নেতাকর্মীর রুমে নিয়মিত মাদক ও ইয়াবা সেবন চলে।

শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্যমতে, বঙ্গবন্ধু হলের দেশীয় ব্লকের প্রথম ব্লকের চতুর্থ তলার ৪০২ নম্বর রুম ও ছাদ, তৃতীয় ব্লকের ছাদ, আন্তর্জাতিক ব্লকের ১১০, ১১৩, ১১৫ নম্বর রুমে নিয়মিত মাদক সেবন চলে, জিয়াউর রহমান হলের ছাদে, লালন শাহ ও সাদ্দাম হোসেন হলের একাধিক রুমে নিয়মিত মাদক সেবন চলে।

গত ২০ জানুয়ারি ক্যাম্পাসের মফিজ লেকে মাদকাসক্ত অবস্থায় এক বহিরাগতসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান। পুলিশের কাছ থেকে দুই শিক্ষার্থীকে কেড়ে নেয় আরাফাত ও তার সমর্থকরা। গত বছরের ৭ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়াউর রহমান হলের ২০৯নং কক্ষ তল্লাশি চালিয়ে ২৫ পিস ইয়াবাসহ দুই বহিরাগতকে আটক করে পুলিশ। এর আগে গত বছরের ৭ মে ক্যাম্পাস সংলগ্ন শেখপাড়া বাজার থেকে ২০০ পিস ইয়াবাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারীকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান সমকালকে বলেন, হলের মধ্যে এসব ঘটে থাকলে তা নিজ নিজ হল প্রশাসনের ব্যাপার। এ ব্যাপারে তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। তবে হল প্রশাসন এ বিষয়ে প্রক্টরিয়াল বডির সহযোগিতা চাইলে সহযোগিতা করা হবে। এ ছাড়া হলের বাইরে মাদকের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইবি থানার ওসি রতন শেখ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা প্রক্টরের পক্ষ থেকে কোনো আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা কিছু করতে পারি না। তবে তারা বললে আমরা অভিযানে যাব।