তামাক শুকাতে ঝুট কাপড় পোড়ানোয় পরিবেশ দূষণ

মেহেরপুর

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

ফারুক হোসেন, মেহেরপুর

মেহেরপুর জেলায় তামাকপাতা শুকাতে জ্বালানো হচ্ছে কাপড়ের ঝুট। এসব ঝুটের কালো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ও কৃষকরা নানারকম রোগবালাইয়ের ঝুঁকি নিয়ে ঝুট কাপড় জ্বালিয়ে তামাক পাতা শুকাচ্ছেন। কৃষকরা বলছেন, কাঠ জ্বালিয়ে তামাকপাতা শুকাতে হলে গাছ কাটতে হয়। এখন জ্বালানি কাঠের দাম বেড়ে গেছে। তাই কাঠ জ্বালিয়ে তামাকপাতা শুকাতে খরচ বেশি হচ্ছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে ঝুট কাপড় জ্বালিয়ে তামাকপাতা শুকাতে থাকলে পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হবে সবাইকে।

আগে তামাকপাতা শুকাতে চাষিরা জ্বালানি হিসেবে কাঠখড়ি ব্যবহার করতেন। এতে পরিবেশ কিছুটা দূষিত হলেও জনস্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ত না। এখন খরচ কমাতে কয়েক বছর ধরে চাষিরা তামাক ঘরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত গার্মেন্ট কাপড়ের ঝুট। এসব ঝুট ঢাকার বিভিন্ন গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি থেকে ব্যবসায়ীরা ট্রাকে পৌঁছে দিচ্ছেন মেহেরপুরের কৃষকদের বাড়ি বাড়ি। ফলে হাতের কাছে সাশ্রয়মূল্যে ঝুট কাপড় দিয়ে তামাক শুকাতে পেরে আর কাঠখড়ি জ্বালাচ্ছেন না তারা। এক ট্রাক (৩০০ মণ) ঝুট কাপড় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকায় কিনতে পারছেন চাষিরা। এতে অন্তত ১২ বিঘা জমির ২৫ ঘরের তামাক শুকানো সম্ভব হচ্ছে। জেলায় এ বছর সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হয়েছে। সেই হিসাবে সব তামাক ঝুট দিয়ে শুকাতে অন্তত ২৫ হাজার টন ঝুট পুড়বে। ১২ বিঘা জমির তামাক কাঠখড়ি দিয়ে শুকাতে হলে এক লাখ টাকার মতো খরচ হয়। ১২ বিঘা জমির তামাক শুকাতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করার জন্য জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি জেনেও ঝুট কাপড় দেদার জ্বালিয়ে যাচ্ছেন চাষিরা। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও পরিবেশবিদরা বলছেন, তামাক পাতা শুকাতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত ঝুট কাপড়ের ব্যবহার এখনই বন্ধ করা উচিত। তা না হলে স্বাভাবিক পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

গাংনী উপজেলার কাথুলী গ্রামের তামাক শুকানোর কাজের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট শ্রমিক সাহারুল ইসলাম বলেন, ঝুট কাপড় দিয়ে তামাক ঘরে জ্বাল দেওয়ার সময় নাকেমুখে মাস্ক বাঁধা থাকে। তারপরও শরীরের চুলকানি, এলার্জিসহ নানারকম সমস্যা দেখা দেয়। এ সময় তামাকের কাজে টাকা একটু বেশি পাই, তাই ক্ষতি হলেও সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ঝুট কাপড় দিয়ে তামাকপাতা শুকাবার কাজ করি।

মেহেরপুর সদর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের তামাকচাষি আমিরুল ইসলাম বলেন, কাঠখড়ি দিয়ে তামাকপাতা শুকাতে খরচ অনেক বেশি। তারপরও জোগাড় করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন আর কেউ গাছ বিক্রি করতে চান না। ঝুট বাড়িতে দিয়ে যাচ্ছে, ঘরে বসেই অর্ডার করলেই পেয়ে যাচ্ছি। আর্থিকভাবেও লাভবান বেশি হওয়া যাচ্ছে। তাই ক্ষতি জেনেও ঝুট দিয়ে তামাকপাতা শুকাচ্ছি।

সদর উপজেলার উজুলপুর গ্রামের ঝুট ব্যবসায়ী নজিবুল ইসলাম বলেন, আমরা ঢাকার বিভিন্ন গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি থেকে যোগাযোগ করে ঝুট কিনে জেলার বিভিন্ন গ্রামে বিক্রি করে থাকি। কয়েক বছর ধরে ব্যবসাটি চলছে। দিন দিন এ ব্যবসার প্রসার ঘটছে। মাত্র তিন মাস ব্যবসাটি চলে। এতে কৃষকরা উপকার পাচ্ছেন, আমাদেরও ব্যবসা ভালো হয়। ঝুট কাপড়ে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হলেও উপকারও তো কম হচ্ছে না। এলাকায় ব্যাপক চাহিদা থাকায় আমরা নিবিঘ্নে ব্যবসাটি করতে পারছি। সরকার বন্ধ করে দিলে আর করতে পারব না।

গাংনী ডিগ্রি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক (অব.) এনামুল আযীম বলেন, ঝুট ব্যবহার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। রঙিন কাপড়ে বিভিন্ন রঙের ব্যবহার করা হয়, যা কেমিক্যাল মিশ্রিত। সেই রঙ আর কেমিক্যাল মিশ্রিত ঝুট কাপড় তামাক ঘরে পোড়ানো হচ্ছে। এই বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে মিশে পরিবেশকে দূষিত করে তুলছে।

মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এহসানুল কবির বলেন যেহেতু ঝুট কাপড়গুলো নানারকম কেমিক্যাল মিশ্রিত তাই কাপড়গুলো আগুনে পোড়ালে ঝাঁঝালো ও উৎকট গন্ধের ধোঁয়া বের হয়। ওই ধোঁয়ায় ফুঁসফুঁসের বিভিন্ন জটিল রোগসহ শ্বাসকষ্টজনিত সব ধরনের রোগ দেখা দেবে। এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে। এই ঝুটের জ্বালানি ব্যবহার জরুরিভাবে বন্ধ করা উচিত।