'দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছর পার হলেও মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকায় আমার নাম ওঠেনি। সংসার চালাতে হয় স্ত্রীর ভিক্ষা করা টাকায়। মরার আগে হলেও অন্তত মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকায় নিজের নামটা উঠেছে সেটি যেন দেখে মরতে পারি।' আবেগাপ্লুত হয়ে এমনটিই বললেন মহম্মদপুর উপজেলার পাল্লা গ্রামের ৯২ বছরের প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসেম শেখ।

আবুল হাসেম উপজেলার দীঘা ইউনিয়নের পাল্লা গ্রামের মৃত আবদুল জব্বার শেখের ছেলে। ১৯৭১ সালে ৮ নম্বর সেক্টর অধীনে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি। এ সময় আঞ্চলিক বাহিনীর অধিনায়ক গোলাম ইয়াকুব বীরপ্রতীকের নেতৃত্বে একাধিকবার যুদ্ধে অংশগ্রহণসহ মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছিলেন আবুল হাসেম। ২০০৪ সালের ৯ আগস্ট তিনি আবেদন করেন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য। কিন্তু তার নাম আজও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় স্থান পায়নি।

সরেজমিন গতকাল শনিবার আবুল হাসেম শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধকালীন আঞ্চলিক বাহিনীর অধিনায়ক মো. গোলাম ইয়াকুব বীরপ্রতীক, মাগুরা জেলা ইউনিটের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোল্যা নবুয়ত আলী, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কমান্ডার আলী রেজা খোকন ও ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল গফুর মোল্যাসহ তার মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যয়নপত্র। একাধিক দপ্তরের সনদ তার সংগ্রহে থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেননি আবুল হাসেম। তিনি পরম মমতায় এগুলো বুকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য।

আবুল হাসেম শেখ বলেন, জায়গা-জমি নেই। মাত্র দুই শতক জমির ওপর একটি দুই চালা টিনের ঘর। চলাফেরা করতে পারি না। জীবন বাঁচানোর তাগিদে স্ত্রী মহিরন নেছা অন্যের দুয়ারে হাত পেতে ভিক্ষা করে যা আনে, তা দিয়েই চলে সংসার। মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম ওঠানোর কথা বলে আমাদের ইউনিয়ন কমান্ডার আবদুল গফুর মোল্যা ছয় বছর আগে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু আজও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম ওঠেনি এবং টাকাও ফেরত দেননি গফুর মোল্যা। তিনি বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান আমার চেকবই নিয়ে আমার নামে আসা অনুদানের ৩৬ হাজার টাকা চেকের মাধ্যমে তুলে আমাকে মাত্র ৮ হাজার টাকা দিয়েছেন। এ বিষয়ে ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল গফুর মোল্যা ও মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে কথা বললে টাকা নেওয়ার বিষয়টি তারা অস্বীকার করেন।

মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ সাদিকুর রহমান গতকাল শনিবার দুপুরে এই মুক্তিযোদ্ধার করুণ অবস্থার কথা জানতে পেরে অসহায় আবুল হাসেম শেখের বাড়িতে যান। এ সময় ইউএনও হাসেমকে জানান, সরকারের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই স্থগিত রয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে আপাতত কিছু করার নেই। তবে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প থেকে বাড়ি বানানোর যে বরাদ্দ চালু আছে, তা থেকে একটি বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার ব্যাপারে তাকে আশ্বস্ত করেন। ইউএনও সমকালকে বলেন, একজন সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধার সংসার স্ত্রীর ভিক্ষার টাকায় চালাতে হয় এটা জেনে আমি মর্মাহত

হয়েছি। আমার দপ্তর থেকে মহান এই যোদ্ধাকে সাধ্যমতো সহায়তা করা হবে।

মন্তব্য করুন