মিরসরাইয়ে ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

বিপুল দাশ, মিরসরাই

মিরসরাইয়ে ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়

কৃষি জমি থেকে এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি কেটে ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছে- সমকাল

মিরসরাইয়ে ফসলি জমির টপ সয়েল বা উপরিভাগের মাটি বিক্রি কোনোভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফসলি জমির মাটি বিক্রি করে দেওয়ার ফলে ফসল উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হতে পারে। উপজেলার ইটভাটাগুলোতে বনের গাছ, পাহাড়ের মাটির পর এবার যাচ্ছে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি। এর আগে পাহাড়ি মাটি দিয়ে ইট তৈরির কাজ চলত। এ মৌসুমে প্রায় চার কোটি ইট তৈরিতে ব্যবহূত মাটির চাহিদা মেটাতে আবাদি জমিতে হাত দিয়েছে ইটভাটা কর্তৃপক্ষ। তবে মিরসরাইয়ের প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর আবাদি জমির কী পরিমাণ মাটি ইটভাটায় যাচ্ছে এর কোনো হিসাব নেই কৃষি অফিসে। ইটভাটার প্রয়োজনে কৃষিজমির মাটি বিকিকিনি প্রসঙ্গে কৃষি বিভাগ উদ্বেগ প্রকাশ করেলেও আইনিভাবে কিছুই করার নেই তাদের।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বুলবুল আহম্মদ জানান, গত ২৮ জানুয়ারি আইন-শৃঙ্খলা বৈঠকে এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের উপস্থিতিতে আলোচনা হয়েছে। তিনি কঠোরহস্তে জমির টপ সয়েলসহ আবাদি-অনাবাদি জমির মাটি বিক্রি রোধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেন; কিন্তু অনেক কিছু জেনেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।

সরেজমিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিম পাশে মিরসরাই সদর ইউনিয়নের তারাকাটিয়া এলাকার মাসুমের বিলে যেতে দেখা মিলে মোহাম্মদ লিটন ও জামাল নামে দুই শ্রমিকের। তারা মাটি বহনকারী পিকআপের চাকায় দেবে যাওয়া জমির মাটি ঠিক করে দেয়। এরপর প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে দেখা যায় একটি এক্সক্যাভেটর মাটি কেটে ভর্তি করছে পিকআপ। এক শ্রমিক জানান, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওই বিল থেকে প্রতিদিন ২৫-৩০টি পিকআপ দিনরাত মাটি নিয়ে যাচ্ছে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে একই ইউনিয়নের গড়িইয়াশ এলাকার প্রিয়া অটো ব্রিক ইটভাটায়। ওই মাটি ইটভাটায় নিতে রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষকের জমি, সুফিয়া সড়ক ও গড়িয়াইশ সড়ক। ওয়াজিউল্যা, কামাল উদ্দিন জানান, মাসুমের বিল থেকে পিকআপ দিয়ে মাটি নিয়ে প্রায় তিনশ' একর ফসলি জমি নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। পিকআপের চাকায় জমির মাটি দেবে যাওয়ার কারণে ওইসব জমিতে আর ভালো ফসল হবে না। যারা মাটি নিচ্ছে তাদের বাধা দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না, কারণ তারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী। তারা শুধু রাস্তার জন্য ফসলি জমি নষ্ট করছে না, সরকারি সড়কের পাশ কেটেও নষ্ট করছে।

মিরসরাই সদর ইউনিয়ন ছাড়াও করেরহাট, দুর্গাপুর, জোরারগঞ্জসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, সামান্য অর্থের লোভে একরের পর একর জমির উপরিভাগের মাটি কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন জমির মালিকরা। রায়পুর এলাকার কৃষক আলতাফ হোসেন জানান, এর আগের মৌসুমেও অন্য একটি জমিতে টপ সয়েল কেটে নেওয়ায় এবার ফলন ভালো হয়নি। মিরসরাই ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম খোকা জানান, উপজেলার ১৪টি ইটভাটায় প্রতি মৌসুমে গড়ে চার কোটি ইট উৎপাদন হয়। প্রতি ২৫ ঘনফুট মাটি দিয়ে তৈরি হয় একটি ইট। বর্তমান সময়ে মিরসরাইয়ের ইটভাটাগুলোতে কৃষিজমিতে পুকুর কেটে মাটির জোগান দেওয়া হচ্ছে। জমির টপ সয়েল খুব বেশি যাচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।

মিরসরাইয়ের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বুলবুল আহম্মদ জানান, টপ সয়েলের ৯ ইঞ্চি থেকে এক ফুট পর্যন্ত খাদ্যকণা থাকে। টপ সয়েল কেটে ফেলার কারণে ফসল তার খাদ্য খুঁজে পায় না। সে কারণে ওইসব জমিতে ভালো ফলন হয় না। যে জমি থেকে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে শুধু ওই জমির উর্বরাশক্তি নষ্ট হচ্ছে না, মাটিভর্তি ট্রাক যেসব জমির ওপর দিয়ে যাচ্ছে, সে জমিগুলোরও উর্বরাশক্তি নষ্ট হচ্ছে।

ইউএনও রুহুল আমিন বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের কঠোর নির্দেশ- কোনো কৃষিজমির মাটি কাটা যাবে না। জমির টপ সয়েল কাটার অপরাধে গত মঙ্গলবার একজনকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আমরা অভিযান অব্যাহত রাখব। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।