সীমান্তের ৮ পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে মাদক

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০১৯

সাজ্জাদ রানা, কুষ্টিয়া ও আহমেদ রাজু, দৌলতপুর

কুষ্টিয়ায় বিজিবির নজরদারি ও টহলের মধ্যেই সীমান্ত দিয়ে মাদক আসছে। তবে আগের তুলনায় মাদক আসা কিছুটা কমলেও থেমে নেই মাদকের কারবার। সীমান্তের অন্তত ৮ পয়েন্ট দিয়ে এখনও মাদক আসছে। বিজিবির কয়েকজন সদস্য ও লাইনম্যানের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি পুলিশেরও ৫১ সদস্যকে বদলি করা হয়েছে মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে। কড়াকড়ির মধ্যেই পুলিশ সম্প্রতি সীমান্ত এলাকা থেকে ফেনসিডিলের দুটি বড় চালান আটক করেছে।

তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা গা-ঢাকা দিলেও এ সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে নতুনরা। পুলিশ ও বিজিবির অব্যাহত অভিযানে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী গা-ঢাকা দিয়েছে, অনেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপারে চলে গেছে। অনেকেই গ্রেফতার হয়ে জেলে। আবার 'বন্দুকযুদ্ধে' মারা গেছে  বেশ কয়েকজন।

দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম মুকুল বলেন, জামালপুর সীমান্তের কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে এখনও মাদক আসছে। তবে ৭০ ভাগ মাদক আসা বন্ধ হয়ে গেছে। পুরনোরা গা-ঢাকা দিলেও যারা আগে বহন করত তারা এখন ব্যবসায়ী সেজে মাদক আনছে।

সরেজমিনে জামালপুরসহ কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্ট ঘুরে মাদক আসা ও কেনাবেচার নানা তথ্য মিলেছে। বিজিবির স্থানীয় ক্যাম্পের সদস্যরাও বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তবে নাম প্রকাশ করে কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

কুষ্টিয়া জেলার সঙ্গে ভারতের প্রায় ৪৬ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা রয়েছে, যা দৌলতপুর উপজেলায় অবস্থিত। ওপারে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও এখনও নদীপথসহ সব মিলিয়ে ২২ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা অরক্ষিত রয়েছে। এসব এলাকার ফাঁকফোকর দিয়ে দিনে ও রাতে অনায়াসে মাদক আসছে। জামালপুর সীমান্তে দাঁড়িয়ে কথা হয় বিজিবির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে। তারা বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরিয়ে দেখান।

বিজিবি সদস্যরা বলেন, তাদের তালিকাভুক্ত ৮৯ মাদক ব্যবসায়ী আছে সীমান্ত এলাকায়। যার মধ্যে জামালপুর গ্রামেরই ৩৫ জন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ গা-ঢাকা দিয়েছে। জেলে আছে বেশ কয়েকজন। 'বন্দুকযুদ্ধে' মারা গেছে একজন। লোকবল কম থাকাসহ অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে কিছু মাদক এখনও আসছে। পুরোপুরি মাদক বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ৭ কিলোমিটার এলাকা পাহারা দেওয়ার জন্য আছেন ৪ জন বিজিবি সদস্য। এ সুযোগ নিচ্ছে অনেকেই।

তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিজিবিরই কিছু সদস্য এখনও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। তাদের ম্যানেজ করেই মাদক আসছে। বিজিবির লাইনম্যানরা এসব টাকা-পয়সা লেনদেন করছে।

এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিলগাথুয়া বিজিবি ক্যাম্পের নিচ দিয়ে, মহিষকুন্ডি মাঠপাড়া, ত্রিমোহনী ঘোনাপাড়া, কারিগরপাড়া, পাকুড়িয়া শ্যামল সরকারের বাড়ির নিচ দিয়ে, ভাগজোত ঘাট ও হাতিশালা মোড় দিয়ে মাদক ঢুকছে।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, জেলার দেড় শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী দ্রুত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ করবে। এসব মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীকে পুনর্বাসনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। যারা আত্মসমর্পণ করবে না তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জেলা পুলিশ।

সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম টুকু বলেন, অভিযানের পাশাপাশি মাদককারবারিদের পুনর্বাসনের আওতায় আনা গেলে ভালো হয়। জেলায় সরকারিভাবে একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু ও ডোপটেস্টের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত বলেন, জেলায় কোনো মাদক থাকবে না। পুলিশের কেউ মাদকে জড়িত থাকলে তার পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ। আমরা মাদক ব্যবসায়ীদের সুযোগ দিতে চাই। তারা যদি আত্মসমর্পণ করে তাহলে ভালো। তাদের আমরা সহায়তা করব। যদি তারা আত্মসমর্পণ না করে তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করা হবে।

মাদক নির্মূলে জেলা কোর কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন বলেন, সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনোভাবেই মাদক প্রবেশ না করে সে বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে। বিজিবির সঙ্গে অন্যান্য বাহিনীকে নিয়ে মাদক নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া পুনর্বাসনে জোর দেওয়া হচ্ছে।