নবগঙ্গায় বিলীন হচ্ছে শুক্তগ্রাম

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯      

মশিউল হক মিটু, কালিয়া (নড়াইল)

গত বর্ষা মৌসুম থেকে চলতি বর্ষায় নবগঙ্গা নদী গ্রাস করেছে নড়াইলের কালিয়ার শুক্তগ্রামের প্রায় দেড়শ' বসতবাড়ি, গাছপালাসহ অন্তত ৮০ একর ফসলি জমি। বছরের পর বছর নদীভাঙনে কালিয়ার মানচিত্র থেকে মুছে যেতে চলেছে উপজেলার গ্রামটি। এবার ব্যাপক হুমকির মুখে পড়েছে প্রায় তিনশ' বছরের পুরনো শুক্তগ্রাম বাজার। ভাঙন শুরু হলে যে কোনো মুহূর্তে সেখানককার সরকারি স্থাপনাসহ মসজিদ, মন্দির ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত কয়েক দশকে শুক্তগ্রামের মানুষের ফসলি জমি 'শুক্তগ্রাম বিল' গ্রাস করেছে নবগঙ্গা। গত বর্ষায় ভাঙনের তীব্রতা ছিল বেশি। এবারও পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতার আশঙ্কা করছেন সেখানকার মানুষ।

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার বাবরাহাচলা ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম শুক্তগ্রাম। উপজেলা সদরের উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে চলা নবগঙ্গা নদীর ঠিক অপরপাড়ে গ্রামটির অবস্থান। স্থানীয়দের মতে, গ্রামটি অতি প্রাচীন জনপদ। অন্তত তিনশ' বছর আগে ওই গ্রামের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে গড়ে উঠেছিল শুক্তগ্রাম বাজার। সেখানে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক মৃৎশিল্পীদের বসবাস। মৃৎশিল্পের নানা সামগ্রী বেচাকেনার জন্য বাজারটি প্রসিদ্ধ। ঐতিহ্যবাহী সেই বাজারটি এখন যে কোনো মুহূর্তে নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কায় করছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিন দেখা গেছে, বাজারের সঙ্গে লাগোয়া নবগঙ্গা নদী। বাজার এলাকায় ভাঙন রোধে নদীর পাড়ে বালুর বস্তা ফেলা হয়েছে। মাঝে মধ্যে পানির তোড়ে ওই বস্তা নদীতে চলে গেছে। সেখানে আছড়ে পড়ছে পানির ঢেউ। বস্তা ফেলার বাইরের অংশে নতুন করে দেখা দিয়েছে ভাঙন।

স্থানীয়রা জানান, গত বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে ওইসব বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন রোধে চেষ্টা চালানো হয়। তার আগেই বর্ষার শুরুতে শুক্তগ্রাম বাজারের পাশের কুমারপাড়া ও চরপাড়া জনপদ দুটি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। গত বছরের ভাঙনে ওই দুটি পাড়ার অন্তত দেড়শ' বসতবাড়ি ও ৮০ একর ফসলি জমি নদীতে চলে গেছে।

শুক্তগ্রাম বাজারে রয়েছে অন্তত দেড় শতাধিক দোকানপাট। উপজেলার উত্তরাঞ্চলে এটিই বড় হাট ও বাজার। এখানে রয়েছে ধান-পাটের বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রয়েছে বাজারকেন্দ্রিক মসজিদ, মন্দির, কমিউনিটি ক্লিনিক, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন ভূমি অফিসসহ নানা সামাজিক স্থাপনা। নদীভাঙন রোধ করতে না পারলে বাজারসহ গ্রামটিই গ্রাস করবে রাক্ষুসে নবগঙ্গা।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, কুমারপাড়ার অরুণ পাল, বিকাশ পাল, রফি মণ্ডল, মিরাজ মোল্লা, কালিদাস পাল, দিলীপ পাল, কুদ্দুস শেখ, দীপক পাল, বেলায়েত শেখ, বাচ্চু শেখ, কামরুল শেখ, কাঞ্চন সরদার, আকতার মণ্ডল, ইমরুল মোল্লা, আকবর খাঁ, কার্তিক পাল, মান্দার খাঁসহ অন্তত ৬৫টি পরিবারের বসতবাড়ি, চরপাড়ার বেলায়েত মোল্লা, শাহাদত খাঁ, কালু মোল্লা, মিজান খাঁ, মনিরুল মোল্লা, ইয়ার আলী, রব্বান শেখ, আহাদ শেখ, রইস শেখ, আজাদ ফকির, জহির শেখ, রাজু শেখ, আমজেদ সরদার, মশিয়ার সরদারসহ অন্তত ৮৫টি পরিবারের বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের শিকার চরপাড়ার ষাটোর্ধ্ব তোবারেক শেখ বলেছেন, তিনবার নদীভাঙনে তার বাড়িঘরসহ প্রায় ৩৫ একর ফসলি জমি নদীতে গেছে। চরপাড়ার আহাদ শেখ (৪০) জানান, তাদের ৭৫ শতাংশের ওপর বসতবাড়ি ছিল। বাড়ির এসব ফল বিক্রি করে চলত সংসার। নদীতে ভেঙে যাওয়ায় এখন তারা নিঃস্ব। কুমারপাড়ার ষাটোর্ধ্ব কুদ্দুস শেখ বলেন, তিন একর ফসলি জমি ছিল, এ ছাড়া বসতভিটার বিভিন্ন জাতের ফল বিক্রি করে চলত সংসার। সব নদীতে গেছে। এখন নদীপাড়ে ঝুপড়িঘর তুলে আছি।

কালিয়ার ইউএনও নাজমুল হুদা বলেন, নড়াইলের জেলা প্রশাসকসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ নেওয়াজ তালুকদার বলেন, বৃহস্পতিবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শুক্তগ্রাম ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। বাজারের আশপাশে সামান্য ভাঙন আছে। এলাকাটিতে নজর রাখা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।