ভিক্ষা করে সংসার চালাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি

বিধবা জামিনা খাতুনকে (৬৫) স্থানীয় লোকজন ভিক্ষুক হিসেবেই চেনে। ৩৫ বছর আগে মুক্তিযোদ্ধা স্বামী তোতা মিয়ার মৃত্যু হয়। সমবয়সী দরিদ্র নারী-পুরুষ মাসে মাসে বয়স্ক ভাতা কিংবা অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলেও জামিনা খাতুনকে দেওয়া হয় না কোনো কিছুই। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে এসব সরকারি ভাতা কিংবা সাহায্য-সহযোগিতার জন্য গেলে তাকে বলা হয়- আপনি মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। আপনার জন্য আলাদা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা রয়েছে। এখান থেকে আপনাকে কোনো কিছুই দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতার জন্য উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সংশ্নিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার বৈধ কাগজপত্র জমা দিয়েও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন না তিনি। ফলে প্রায় ২০ বছর ধরে তাকে সংসার চালাতে হচ্ছে ভিক্ষা করে।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কি.মি. দূরে মুক্তিযোদ্ধা তোতা মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় ছোট্ট একটি টিনের ঘরে বাস করেন জামিনা খাতুনসহ তার পরিবারের ছয় সদস্য। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের তিন বছর আগে উপজেলার টোক ইউনিয়নের পাচুয়া গ্রামের নায়েব আলীর ছেলে তোতা মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। অতি দরিদ্র তোতা মিয়া তখন মাটির ঘর নির্মাণের কাজ ও মৌসুমি ফলের ব্যবসা করতেন। দেশে যুদ্ধ শুরু হলে তোতা মিয়া স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভারতের আগরতলা চলে যান। প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের নানা জায়গায় যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হলে বাড়ি ফিরে আগের পেশায় জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন তিনি। হঠাৎ একদিন বাড়িতে আগুন লেগে তার সহায়-সম্বল সবকিছু পুড়ে যায়। অভাব-অনটনের ফলে পৈতৃক ভিটামাটিসহ প্রায় দেড় বিঘা জমির সবটুকুই দফায় দফায় বিক্রি করে দেন তোতা মিয়া।

জামিনা খাতুন বলেন, ৩৫ বছর আগে মারাত্মক পেট ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তার স্বামী তোতা মিয়ার। মুমূর্ষু অবস্থায় দুই দিন ঘরে পড়ে থাকলেও অভাবের কারণে তার চিকিৎসা করার সাধ্য ছিল না। তখন তার একমাত্র ছেলে খোকা মিয়ার বয়স ছিল সাত বছর। মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালিয়ে ছেলে খোকাকে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়ালেখা করাতে পারেননি। পরে খোকা সংসারের হাল ধরতে কাঠমিস্ত্রির কাজে যোগ দেয়। মা আর ছেলে দীর্ঘ কয়েক বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে চার কাঠা জমি কিনে একটি ছোট ঘর তৈরি করেন। বর্তমানে ছেলে খোকা, তার স্ত্রী ও তিন ছেলেসহ ছয় সদস্যের পরিবারের হাল ধরেন জামিনা খাতুন। রোগশোকে শরীর ভেঙে পড়ায় এখন পরের বাড়িতে কাজ করতে পারেন না বলে বাধ্য হয়ে ভিক্ষা করেন তিনি।

স্থানীয় শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র দাস বলেন, সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছে। অথচ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হয়ে তিনি আমাদের চোখের সামনে বছরের পর বছর ভিক্ষা করে যাচ্ছেন, যা দেখে খুবই কষ্ট হয়। মুক্তিযোদ্ধা ভাতার জন্য তাকে নিয়ে বিভিন্ন সময় সংশ্নিষ্ট সবার কাছেই গিয়েছি এবং সবাই শুধু আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছেন, তবে কোনো সমাধান হয়নি। তিনি জানান, তোতা মিয়ার নাম মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা পদ্মায় ক্রমিক নং ১৫০ এবং মেঘনায় ক্রমিক নং ১৩১৩। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ২০০৫ সালের ১ ডিসেম্বর প্রকাশিত বেসামরিক গেজেট মুক্তিযোদ্ধার তথ্যে বর্ণিত ১০৯৪৭ পৃষ্ঠায় তার গেজেট নং ২৭১৬।

এ বিষয়ে সাবেক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বজলুর রশিদ মোল্লা বলেন, আমরা জামিনা খাতুনের কাগজপত্র জমা নিয়েছি এবং তার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব।