এক সময় ডুমুরিয়ার শরাফপুর যেন বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। লবণাক্ততার কারণে ফসল উৎপাদনের শত চেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে জেগে উঠতে শুরু করেছে সবুজ। কৃষকের মুখে ফুটে উঠছে হাসি।

ফসলের সফলতার ইতিবৃত্ত উঠে এসেছে শরাফপুর ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবির ভাষ্যে, যখন এলাকাজুড়ে নোনা পানির প্রভাব, তখন এ অঞ্চলের মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল নোনা পানির চিংড়ি (বাগদা) চাষ। জমিতে অনেকবার বীজ বপন ও বিভিন্ন গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। কিন্তু নোনা পানির প্রভাবে এলাকায় কোনো সবজি বা ফসল উৎপাদন সম্ভব হয়নি। ক্ষেতের বীজতলা বহুবার নষ্ট হয়েছে। সর্বস্বান্ত হয়েছেন এলাকার বহু কৃষক। নোনা পানিপ্রবণ এলাকায় কৃষি বিভাগের বিশেষ প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের শত শত কৃষক উপকৃত হচ্ছেন।

লবণাক্ত এলাকার জমিতে সবজি বা অন্যান্য ফসল উৎপাদন হতে চায় না। লবণের মতো ক্ষতিকর পদার্থ বিনাশ করেই ক্ষেতে সর্জন পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন করতে হয়। এ পদ্ধতিতে লবণাক্ত জমিতে প্রতি বিঘায় দুই কিস্তিতে ২০ কেজি পটাশ, তিন কিস্তিতে ১৫ কেজি জিব সার এবং ১০ ভ্যান গাড়ি জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। এ ছাড়া সংশ্নিষ্ট জমিতে মিষ্টি পানি ব্যবহার করতে হবে। এ পদ্ধতি ব্যবহার করে ডুমুরিয়ায় নোনা পানিপ্রবণ এলাকায় হাজারো কৃষক কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। কথাগুলো বলছিলেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোছাদ্দেক হোসেন।

উপজেলার ভুলবাড়িয়া গ্রামের সবজি চাষি লেয়াকাত আলী গাজী জানান, গত বছর থেকে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে লবণাক্ত জমিতে বৃষ্টির পানি মজুদ রেখে এবং জিব সার, পটাশ ও জৈব সার ব্যবহার করে তিনি একই জমিতে সবজি, ধান ও মাছ চাষ করেন।

ডুমুরিয়া উপজেলার সবচেয়ে বড় তরমুজ চাষি কামাল বাওয়ালী বলেন, তার নিজস্ব ২ বিঘা জমিতে আগে ধান চাষ করতেন। তেমন একটা লাভের মুখ দেখেননি। নিজ উদ্যোগ আর কৃষি বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে জমিতে কয়েকটি ছোট ছোট গর্ত খুঁড়ে সেখানে বৃষ্টির পানি মজুদ রেখে এবং লবণনাশক সার ব্যবহার করে একই জমিতে গত দুই বছর তরমুজ চাষ করেন। চলতি বছর ওই তরমুজ চাষে খরচ হয় ৫৬ হাজার টাকা। উৎপাদিত তরমুজ চাষে বাম্পার ফলনে সব খরচ বাদ দিয়ে তিনি ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা লাভ করেন।

মাগুরখালী এলাকার কৃষক প্রশান্ত কুমার মণ্ডলের ভাষ্য, মাগুরখালী বিলে তার ১০ বিঘা জমি রয়েছে। নোনা পানির প্রভাবে সম্পূর্ণ জমি প্রায় পতিত থাকত। কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে এবার চলতি আমন মৌসুমের আগে ওই জমির চারপাশ দিয়ে ড্রেন কেটে সেখানে বৃষ্টির মিষ্টি পানি মজুদ রাখেন। চলতি বছর ১০ বিঘা জমিতে ২৫ মণ আমন ধান ফলিয়েছেন। এলাকার কিছু অংশজুড়ে নোনা পানির চিংড়ি চাষ চলছে। তবে কম খরচ, সহজ পদ্ধতি আর বেশি লাভ বলে এখন মানুষ সবজি চাষে ঝুঁকছে। সব মিলিয়ে নোনা পানিপ্রবণ ডুমুরিয়ার কৃষিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

লবণাক্ত এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা করুণা মণ্ডল ও সুধা রানী জোয়ার্দার জানান, নোনা পানিপ্রবণ এলাকার জমির চারপাশজুড়ে ড্রেন, ছোট ছোট পুকুর বা গর্ত করে বৃষ্টির পানি মজুদ রাখা এবং জমিতে নিয়ম অনুযায়ী পটাশ, জিব সার ও জৈব সার প্রয়োগ করে সর্জন পদ্ধতি ব্যবহার করে মাঠে ফসল ফলানো সম্ভব। এ ছাড়া আরেকটি পদ্ধতিতে জমিতে মাদা তৈরি করে সেখানে বীজ বপনের পর মাদাগুলো খড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। খড় দিয়ে মাদা ঢেকে রাখলে মাটিতে রস ধরে রাখা যায়। এসব পদ্ধতি বা প্রযুক্তি ব্যবহার করার ফলে লবণ প্রতিরোধ করা যায় বা লবণাক্ততা কেটে যায়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক নিয়মে এ অঞ্চলে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নদীর পানি মিষ্টি থাকে এবং জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নদীর পানি লবণাক্ত থাকে।

উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, ডুমুরিয়া উপজেলার মধ্যে মাগুরখালী ইউনিয়নটি সম্পূর্ণ এবং শরাফপুর ও শোভনা এ দুটি ইউনিয়নে অংশিক আশির দশক থেকে নোনা পানির চিংড়ি চাষের প্রভাব বিস্তার ঘটে। বিপন্ন হয় কৃষি ও সবুজ বনভূমি। লবণাক্ত এলাকায় লবণসহিষুষ্ণ জাতের মাধ্যমে, বৃষ্টির মিষ্টি পানি ব্যবহার ও পটাশ-জিপ সার ও জৈব সার প্রয়োগে ওই অঞ্চলের কৃষকরা এখন একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে আমন, আউশ, ভুট্টা, তরমুজ, আলু, পেঁয়াজ, বেগুন, লাউ, টমেটো, কুমড়া, শিম, বরবটি, লালশাক, পুঁইশাক, কপি, মুলা, পালংশাকসহ ওই লবণাক্ত এলাকায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার টন সবজি উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক ও কৃষি দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে গত সাড়ে তিন বছরে ওই তিনটি ইউনিয়নে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি কৃষি আবাদের আওতায় এসেছে, যা মোট আবাদি জমির ৭৫ ভাগ। সরকারিভাবে লবণাক্ত এলাকার ২ হাজার কৃষক-কৃষানিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিনামূল্যে ওই সব কৃষককে সার, বীজসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করা হচ্ছে।

ডুমুরিয়ার ইউএনও আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ডুমুরিয়ায় নোনা পানিপ্রবণ এলাকায় উপজেলা কৃষি অফিস নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কৃষকদের নানামুখী প্রশিক্ষণসহ সরকারি সব সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ডুমুরিয়ায় নোনা পানিপ্রবণ এলাকায় সবজি চাষ বৃদ্ধির ফলে বিশেষ করে দরিদ্র নারীদের মাঠে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এতে নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বেড়েছে।

সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এমপি বলেন, বিশেষ করে ডুমুরিয়ার লবণাক্ত অঞ্চলগুলোকে চিহ্নিত করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে ওই সব এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসিসহ উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প দিয়ে খাল খনন ও গ্রামীণ সড়কগুলো সংস্কার করা হচ্ছে। এর ফলে এলাকার কৃষকদের যাতায়াত সহজ হয়েছে এবং তারা মিষ্টি পানির চাহিদা মেটাতে পারছেন। ডুমুরিয়ার লবণাক্ত এলাকার কৃষকরা এখন তাদের উৎপাদিত সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি করছেন।

মন্তব্য করুন