কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা আর আখের উৎপাদন সংকটে ধ্বংসের দোরগোড়ায় জিল বাংলা চিনিকল লিমিটেড। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে এই চিনিকল এলাকার আখ চাষিরা দিন দিন আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে ক্রমেই উৎপাদন হ্রাস পেয়ে লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে চিনিকলটি বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

১৯৫৮ সালে ১৫১ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় জিল বাংলা চিনিকল লিমিটেড। বর্তমানে জিল বাংলা চিনিকলে শ্রমিক-কর্মচারী সংখ্যা প্রায় ৬০০ জন। তার মধ্যে স্থায়ী ২৪৪ জন, মৌসুমি ২৮৩ জন, কর্মকর্তা ৩৫ জন ও চুক্তিভিত্তিক ৩৮ জন। পদ শূন্য রয়েছে ৩৮৯টি। শুরুর দিকে প্রতিদিন এক হাজার ১৬ টন আখ মাড়াই করে প্রায় ৬৫ টন চিনি উৎপাদন করে লাভে ছিল মিলটি। দেওয়ানগঞ্জের মাটি ও পরিবেশ আখ চাষের অনুকূল। এখানে অন্যান্য ফসলের চেয়ে আখ চাষ লাভজনক বলে দাবি চাষিদের।

আখ চাষিরা জানান, এক বিঘা জমিতে আখ চাষ করে উৎপাদন ব্যয়ের তিনগুণ লাভ হয়। বিঘাপ্রতি আখ চাষে ব্যয় ১৪ হাজার টাকা (মিলে আখ সরবরাহসহ) এবং বিঘাপ্রতি ৩০০ মণ ফলন হলে মিলে আখ সরবরাহ করে চাষিরা পান প্রায় ৪০ হাজার টাকা। জিল বাংলা চিনিকল লিমিটেডের ৫৪ একর নিজস্ব বীজতলা রয়েছে। এখানে উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন করে চাষিদের মাঝে বিতরণ করা হয়। সার-কীটনাশকও প্রদান করা হয়। এরপরও কিছু ত্রুটির কারণে দিন দিন আখ চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন চাষিরা। এর মধ্যে মিলে আখ সরবরাহের অনুমতিপত্রের (পুর্জি) সুষম বণ্টনের অভাব ও সীমাবদ্ধতা, মিলে আখ সরবরাহ করে সঠিক সময়ে টাকা না পাওয়া অন্যতম।

গত পাঁচ বছরের রেকর্ড অনুসন্ধানে দেখা যায়, মিলটি ২০১৫-১৬ মৌসুমে ৭০ দিনে ৫৮ হাজার ৫৩৫ টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন করে ৪ হাজার ৭৯ টন, লোকসান দিয়েছে ৩৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ মৌসুমে ৭৮দিনে ৬২ হাজার ৪৩৪ টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন করে চার হাজার ৬৬৯ টন, লোকসান দিয়েছে ৩২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ মৌসুমে ১০২ দিনে ৮৩ হাজার ৩৫৩ টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন করে ৫ হাজার ৬০৮ টন, লোকসান দিয়েছে ৩৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ১০১ দিনে ৮৩ হাজার ৫০৪ টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন করে পাঁচ হাজার ২২২ টন, লোকসান দিয়েছে ৬২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ মৌসুমে ৮৫ দিনে ৭০ হাজার ৬৮৯ টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন করে পাঁচ হাজার ১৫৩ টন, লোকসান দিয়েছে ৫৬ কোটি টাকা। চলতি ২০২০-২১ আখ মাড়াই মৌসুমে ৮০ হাজার টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ছয় হাজার ২০০ টন।

জিল বাংলা চিনিকল লিমিটেডের ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রায়হানুল হক রায়হান বলেন, সরকার মিলটিকে টিকিয়ে রাখতে তৎপর। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জন্য মিলটি প্রতি বছর লোকসান গুনছে। মিলটির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অবহেলা-অনিয়ম দূর করতে পারলেই মিলের লোকসান কাটানো সম্ভব।

জিল বাংলা চিনিকল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ আলী বলেন, মিলটির লোকসানের অন্যতম কারণ হচ্ছে চিনি উৎপাদনের চেয়ে উৎপাদন ব্যয় বেশি। এ মিলে চিনি উৎপাদন ব্যয় প্রতি কেজি ১১৬ টাকার ওপরে। অন্যদিকে এক বছরের ফসল আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষিরা। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের গড়িমসি, অনিয়ম বা দূর্নীতি নেই। তিনি বলেন, মিলটির যন্ত্রাংশ পুরোনো হওয়ায় দৈনিক আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হচ্ছে না। এ কারণে চাষিদের আখ ক্রয় করতে সময়ক্ষেপণ করতে হচ্ছে। লোকসানের আরেকটি কারণ এ মিলের সোনালী ব্যাংকে ২০৫ কোটি, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের কাছে ২০৮ কোটি এবং ২৫ কোটি টাকা সরকারি ঋণ রয়েছে। প্রতি বছর যে ঋণের সুদ দিতে হয় ৩২ কোটি টাকা।

মন্তব্য করুন