বিবিয়ানা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে কুশিয়ারা নদীর উভয় তীরের প্রতিরক্ষা বাঁধ প্রকল্পের ব্লক তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাতিল, নিম্নমানের বালু ও পাথর দিয়ে ব্লক তৈরি করছেন ঠিকাদার। এ ছাড়া বালু-পাথর ও সিমেন্ট মিশ্রণের সঠিক অনুপাত মানা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, সিলেটের শেরপুর এলাকায় কুশিয়ারার তীরে বিবিয়ানা পাওয়ারপ্লান্ট রক্ষাসহ একাধিক নদী উন্নয়নে ৫৭৩ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। বর্তমানে কুশিয়ারা নদীর ভাঙন রোধে সিলেটের ওসমানীনগর অংশে ব্লক স্থাপনের কাজ চলছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্লক স্থাপনের কাজ করছে আরএফএল গ্রুপের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরপিএল-আরইজেভি-প্রাণ এবং প্রায় ২৭ কোটি টাকার কাজ করছে নেশনটেক কমিউনিকেশনস লিমিটেড। এ দুই প্রতিষ্ঠান পাঁচটি প্যাকেজে প্রায় শত কোটি টাকার কাজ করছে।

আরপিএল-আরইজেভি-প্রাণ ব্লক তৈরিতে নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করছে। সম্প্রতি হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১০ হাজার সিএফটি পাথর বাতিল করে মাঠ থেকে সরানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু ঠিকাদার বাতিল পাথরের ওপর নতুন পাথর রেখে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বালু-পাথর-সিমেন্ট মিশ্রণের সঠিক অনুপাত সম্পর্কে জানতে চাইলে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের জহিরুল ইসলাম জানান, ১:৩:৬ অনুপাত অর্থাৎ দুই বালতি সিমেন্টের সঙ্গে ছয় বালতি বালু এবং ১২ ঝুড়ি (টুকরি) পাথরে সঠিক মিশ্রণ তৈরি হয়। অথচ প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের সঙ্গে সাত বালতি বালু এবং ১৩ ঝুড়ি পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত মঙ্গলবার সরেজমিন সাদিপুর এলাকায় গিয়ে বাতিল পাথরের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারের প্রজেক্ট ইনচার্জ শামীম রেজা দাবি করেন, কোনো পাথর বাতিল করা হয়নি। তবে আরপিএলের অ্যাডমিন আবু কাওছার কিছু পাথর বাতিলের কথা স্বীকার করেছেন। তার দাবি, বাতিল পাথরগুলো মাঠ থেকে সরানো হয়েছে। তবে নিম্নমানের পাথর বাতিল করে মাঠ থেকে সরানোর ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের চিঠি দেওয়ার কথা অস্বীকার করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পাথর পরিবহনের সঙ্গে জড়িত একাধিক চালক ও ঠিকাদারের স্টোরকিপার জনি ইসলাম জানিয়েছেন, মাঠ থেকে কোনো পাথর সরানো হয়নি।

নেশনটেক কমিউনিকেশনস ব্লক তৈরিতে নিয়মের চেয়ে এক বালতি বালু এবং এক ঝুড়ি পাথর বেশি ব্যবহারের পাশাপাশি নিম্নমানের বালু এবং অপরিচ্ছন্ন পাথর ব্যবহার করছে। গত শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, অপরিচ্ছন্ন পাথর ও বালু দিয়ে ব্লক তৈরি করা হচ্ছে। ব্লক তৈরির মিশ্রণে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের সঙ্গে আট বালতি বালু ও ১২ ঝুড়ি পাথর ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে সাইট ইঞ্জিনিয়ার ফখরুল ইসলামের দাবি, ছয় থেকে সাত বালতি বালু ও ১১ ঝুড়ি পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। এ সময় তৈরি করে রাখা দুটি ব্লকের ভেতরে মাটি থাকতে দেখা যায়। যে ব্লকগুলোর ভেতর থেকে সামান্য কাঠির আঘাতে মাটি বেরিয়ে আসছিল।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প সংশ্নিষ্ট সেকশন অফিসার জহিরুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন আগে প্রায় ১০ হাজার সিএফটি পাথর বাতিল করা হয়েছে, যেগুলো তাদের মাঠেই ছিল। কয়েক দিন মাঠে যেতে পারেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞরা ব্লকের নমুনা নিয়ে যাবেন। মান পরীক্ষার পর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহানেওয়াজ তালুকদার বলেন, পাথর বাতিল করার পর আমরা তাদের চিঠি দিয়েছি। বাতিল করা পাথর ব্যবহার এবং অনিয়ম করলেও পার পাবেন না তারা। কারণ কিছু নমুনা নিয়ে ব্লকের মান পরীক্ষা করা হবে। নেশনটেকের অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগগুলো সঠিক নয়।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাহ ইসমাইল আলী বলেন, ঠিকাদার ব্লক তৈরিতে নানা অনিয়ম করছেন। তাদের মালবাহী যানবাহনের কারণে কুশিয়ারা ডাইক দেবে যাচ্ছে। কাঁচা সড়কে ধুলার আবরণ তৈরি হওয়ায় এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরপিএল-আরইজেভি-প্রাণের প্রজেক্ট ইনচার্জ শামীম রেজা বলেন, আমাদের কোন পাথর বাতিল করা হয়নি। এ ধরনের কোনো চিঠিও পাইনি। আমরা নিয়ম মেনেই কাজ করছি। কাজে কোনো অনিয়ম হলে নমুনা পরীক্ষায় ধরা পড়বে।

নেশনটেক কমিউনিকেশনসের ইনচার্জ ইমরান হোসেন বলেন, বালুতে সামান্য মাটি দেখা গেলেও সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের সঙ্গে নিয়ম মতো বালু-পাথর দেওয়া হচ্ছে। কখনও হয়তো শ্রমিকের হিসাবের ভুলে বেশি পড়তে পারে।

হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজ বলেন, কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। শিগগিরই কাজগুলো পরিদর্শন করবেন বলে জানান তিনি।

মন্তব্য করুন