সরকারের 'জমি আছে ঘর নেই' প্রকল্পে ঘর দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে হতদরিদ্রদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যশোরের মনিরামপুরের ঝাঁপা ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে তিনশ দরিদ্র মানুষের প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা করে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। দুই বছর পার হলেও ঘর অথবা টাকা ফেরত না দেওয়ায় দরিদ্র মানুষেরা ফুঁসে উঠেছে। তাদের অভিযোগ, ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল হক মন্টুর নাম করে কয়েকজন ইউপি সদস্য ও দালাল এ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঝাঁপা ইউনিয়নের হতদরিদ্রের তালিকা চাওয়া হয় ইউনিয়ন পরিষদের কাছে।

ইউপি সচিব এনামুল কবির জানান, ঝাঁপা ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান শামছুল হক মন্টু ২২৬ জনের তালিকা পাঠান। সরকার বরাদ্দ দেয় ১০৩টি। সে অনুসারে টিনের ছাউনি দেওয়া সেমিপাকা এক কক্ষের (টয়লেটসহ) ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ঘর দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে তিনশ হতদরিদ্রের কাছ থেকে পাঁচ থেকে ১০ হাজার করে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল হক মন্টুর নাম করে এ টাকা হাতিয়ে নেন ইউপি সদস্য আবদুর রশিদ, শরিফুল ইসলাম, লাকি বেগম, শাহিন আরা, পরিষদের ই-সেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা ডলি খাতুনসহ বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। এছাড়াও টাকা হাতিয়ে নেন চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন কবির খান, আবুল কাশেম, মতিন সরদার, বজলুর রহমান, হাফিজুর খাঁসহ ৯/১০ জন। দুই বছর আগে টাকা নিলেও আজও ওই সাড়ে তিনশ দরিদ্রের ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়নি। তারা টাকা ফেরত পেতে চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্যদের কাছে ধরনা দিলেও তারা টাকা ফেরত দিচ্ছেন না।

কথা হয় ঝাঁপা উত্তরপাড়ার মৃত কলিম গাজীর স্ত্রী ভিক্ষুক রাশিদা বেগমের (৬০) সঙ্গে। তিনি জানান, দুই বছর আগে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য তিনি ভিক্ষা করে চেয়ারম্যান শামছুল হক মন্টুর কাছে ১০ হাজার টাকা দেন। এ পর্যন্ত তাকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়নি।

হানুয়ার গ্রামের চায়ের দোকানি সোহরাব হোসেনের স্ত্রী রিজিয়া খাতুন জানান, স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুর রশিদ ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার কথা বলে চেয়ারম্যানের নামে তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেন।

একই অভিযোগ করেন হানুয়ারের কুলসুম বিবি, আহম্মদ আলী, গোলাম রসুলসহ আরও অনেকে।

অপরদিকে হানুয়ার গ্রামের মতিয়ার রহমান, আলা উদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম, রহিমা খাতুন অভিযোগ করেন, তাদের কাছ থেকে ঘর দেওয়ার নাম করে সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য লাকি বেগম ১০ হাজার করে টাকা নেন। দোদাড়িয়া গ্রামের মহাসিন কবির, মিলন হোসেন, কুতুব উদ্দিন, আফসার মোড়ল, ফিরোজ হোসেন, লাল্টু হোসেন, নুর জাহান বেগম অভিযোগ করেন, স্থানীয় মহিলা ইউপি সদস্য শাহিন আরা ঘর নির্মাণের জন্য তাদের কাছ থেকে একই হারে টাকা আদায় করেন। অভিযোগ রয়েছে, অপর ইউপি সদস্য শরিফুল ইসলাম ঝাঁপা পশ্চিমপাড়ার ভিখারী ফাতেমা বেগম, আমেনা বেগমসহ বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে একইভাবে টাকা আদায় করেন।

রাজগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতা আবুল বাশার চাকলাদার বলেন, চেয়ারম্যানের

নেতৃত্বে অধিকাংশ ইউপি সদস্য এবং বেশ কয়েকজন দালাল অন্তত চারশ হতদরিদ্রের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছেন। এ বিষয়ে দুদকসহ সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা মিকাইল হোসেন একই অভিযোগ করে জানান, এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

জেলা যুবমহিলা লীগের সহসভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান নাজমা খানম এ ব্যাপারে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

পরিষদের ই-সেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা ডলি খাতুন অবশ্য ইতোমধ্যে ঝাঁপা উত্তরপাড়ার ভিখারী মাজেদা খাতুন, রোকেয়া খাতুন এবং কুলসুম বেগমকে টাকা ফেরত দিয়েছেন। তবে ডলি খাতুন জানান, তিনি কারও কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করেননি এবং ফেরতও দেননি।

টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল হক মন্টু বলেন, আসন্ন

নির্বাচনকে সামনে রেখে হেয় প্রতিপন্ন করতে একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। ইউপি সদস্য আবদুর রশিদ, লাকি খাতুন,শাহিন আরা, শরিফুল ইসলামসহ অন্যরাও টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ বায়োজিদ দাবি করেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

ইউএনও সৈয়দ জাকির হাসান বলেন, এ ব্যাপারে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। দোষীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন