আমতলী উপজেলার আঠারগাছিয়া, কুকুয়া ও চাওরা ইউনিয়নে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা পাঁচ ড্রাম চিমনির ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার কয়েক দিন পর ফের চালু করা হয়েছে। প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর তা দেখেও নির্বিকার। অবৈধ এ ভাটাগুলোতে করাতকল বসিয়ে দেদার পোড়ানো হচ্ছে কাঠ।

আমতলী উপজেলার আঠারগাছিয়া ইউনিয়নের রায়বালা গ্রামের মাহবুব মৃধা এমএমবি, খাকদান গ্রামের মধু প্যাদা ফাইভ স্টার ব্রিকস, কৃষ্ণনগর গ্রামের আবুল হোসেন এএমবি, ইব্রাহিমপুর গ্রামের মন্টু এমএসবি ও কাউনিয়া গ্রামের ইসমাইল হোসেন মাস্টার জেবিবি ইটভাটা আবাসিক এলাকায় কৃষিজমিতে চালু করে। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের লাইসেন্স ছাড়া ড্রাম চিমনির এ ইটভাটাগুলো গড়ে তোলা হয়। গত ১০ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তর এই পাঁচটি অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেয়।

সরেজমিন গত বৃহস্পতিবার ঘুরে দেখা গেছে, গুঁড়িয়ে দেওয়া ভাটাগুলো চালু করে তাতে ইট পোড়ানো হচ্ছে। ড্রাম চিমনির এসব ভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য ভাটার মধ্যেই বসানো হয়েছে অবৈধ করাতকল। করাতকলে কাঠ চেরাই করে তা দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে ইট।

রায়বালা গ্রামের এমএমবি ব্রিকসে সাংবাদিকের আগমনের খবর পেয়ে ম্যানেজার জসিম আগেই সটকে পড়ে। দূরে দাঁড়িয়ে কাজের তদারকি করছিল ভাটার এক অংশীদার আনোয়ার হোসেন মৃধা। সাংবাদিকরা তাকে কথা বলার জন্য ডাকলেও কর্ণপাত না করে কাজ ফেলে দ্রুত পালিয়ে যায়।

সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে, প্রভাব খাটিয়ে, প্রশাসনকে ম্যানেজ করে গ্রামের ফসলি জমি দখল করে এসব ভাটা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে রায়বালা, খাকদান, কৃষ্ণনগর, ইব্রাহিমপুর এবং কাউনিয়া গ্রামে দেখা দিয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়। এসব গ্রামে ভাটার পাশের জমিতে এখন আর আগের মতো ফসল ফলে না। ড্রাম চিমনির কারণে গাছপালা এবং ঘরবাড়িতে ভাটার নির্গত ছাই জমে থাকে। নারিকেল, আমসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ গাছে ফল ধরেও শুকিয়ে যাচ্ছে।

কৃষ্ণনগর গ্রামের এএমবি ব্রিকসের পাশেই রয়েছে কুকুয়া আদর্শ মাধ্যমিক ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি হাসপাতাল ও কুকুয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্ল্নেক্স। ইব্রাহিমপুর গ্রামে এমএসবি ব্রিকসের ১৫০ মিটার দূরেই রয়েছে ইব্রাহিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কাউনিয়া গ্রামের জেবিবির ১০০ মিটার দূরেই রয়েছে কাউনিয়া সরকারি প্রাথমিক এবং কাউনিয়া ইব্রাহিম একাডেমি মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

রায়বালা গ্রামের আকবর আলী বলেন, 'ভাই গ্রামের মধ্যে ইটভাটার লাইগ্যা মোরা ধুলাবালি আর ছাইয়ে মইর‌্যা গেছি। এহন আর বাড়িতে থাহন যায় না। ঠিকমতো ঘুমান যায় না, গাছপালায় ফল অয় না, জমিতে ধান নাই, ডাইল মরিচ আলুসহ রবি ফসল এহন আর মোরা চোহে দ্যাখতে পাই না।'

ইব্রাহিমপুর গ্রামের চানমিয়া বলেন, 'ভাটার ছাইতে স্কুল অন্ধকার অইয়া যায়। ছাই আর ধুলায় গ্রামের মানুষের হাঁচি-কাশি আর শ্বাসকষ্ট দেখা দিছে। ভাটায় মোগো সব শান্তি কাইর‌্যা নিছে।'

এসব অবৈধ ভাটার সন্ধান পেয়ে গত ১০ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রোজিনা আক্তারের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করে ভেকু দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

অভিযানের কিছুদিন যেতে না যেতেই উল্লিখিত পাঁচ ভাটার মালিকরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ভাটাগুলো ফের চালু করেছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রায়বালা গ্রামের এমএম ব্রিকসের মালিক মাহবুব মৃধা গুঁড়িয়ে দেওয়া ভাটা চালুর কথা স্বীকার করে বলে, সবাইকে ম্যানেজ করেই চালু করেছি।

কাগজপত্র এবং লাইসেন্স ছাড়া গুঁড়িয়ে দেওয়া ভাটা কীভাবে চালু করেছে, খাকদান গ্রামের ফাইভস্টার ব্রিকসের মালিক মধু প্যাদা এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।

বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুজ্জামান সরকার বলেন, অবৈধ এ ভাটাগুলোতে ফের অভিযান পরিচালনা করে বন্ধ করে দেওয়া হবে।

বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান জানান, অবৈধ এ ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে আবারও দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য করুন