দু'পক্ষের ধারাবাহিক সংঘর্ষের পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে আশুগঞ্জের বড়তল্লা গ্রাম। পাড়া-মহল্লার দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সব বন্ধ। মাঠের পাকা ধান ঘরে ওঠানো, বিয়েসহ পূর্বনির্ধারিত বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন গ্রামবাসী। এ ব্যাপারে তারা স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এদিকে গ্রামবাসীর সমস্যা সমাধান ও ধান কাটা বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।

ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র জানা গেছে, উপজেলার সদর ইউনিয়নের বড়তল্লা গ্রামে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করেন। গ্রাম্য আধিপত্যকে কেন্দ্র করে তিন-চার বছর আগে গ্রামের বাহার মিয়া বাড়ি, কেরানী বাড়ি, করিমের বাড়ি, নেয়ামত মিয়ার বাড়িসহ কয়েকটি বাড়ির লোকজন নিয়ে একটি 'জোট' এবং আনছার আলীর বাড়ি, সেকুল মিয়ার বাড়ি, ছয়ঘর বাড়ি ও বলা-কালার বাড়িসহ আরও কয়েকটি বাড়ির লোকজন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী 'মহাজোট' গঠিত হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ 'জোট-মহাজোট' নানা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কমপক্ষে ৮-১০ দফা সংঘর্ষে জড়ায়। প্রতিনিয়তই এ 'জোট-মহাজোটে' বিরাজ করছে উত্তেজনা। এসব সংঘর্ষে কেউ নিহত না হলেও দু'দফা পুলিশসহ আহত হয়েছেন অন্তত দুই শতাধিক মানুষ। ঘটেছে বাড়িঘর ভাঙচুরসহ লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসনসহ উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে হয়েছে বেশ কয়েক দফা সালিশ। কখনও মীমাংসা-সমঝোতা হলেও নানা কারণে তা এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়নি। গ্রামবাসীর দাবি, কিছু বিত্তশালীর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ইন্ধনেই এ অবস্থা তৈরি হয়েছে।

এ অবস্থায় ২ মে সংঘটিত ভয়াবহ সংঘর্ষে পুলিশের ছয় সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০-৩৫ জন আহত হয়েছেন, আতঙ্ক তৈরি করতে খড়ের গাদায় আগুন দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় ও জানমালের নিরাপত্তায় পুলিশ বাদী হয়ে সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশকে আক্রমণ করে আহত করায় উভয় জোটের ৮৪ জনের নাম উল্লেখসহ ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা করে। এর আগে আরও একটি সংঘর্ষে পুলিশকে আক্রমণের ঘটনায় একটি মামলাসহ অন্তত তিন-চারটি মামলা চলমান রয়েছে। সর্বশেষ সংঘর্ষের পর ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়। বাকি দাঙ্গাবাজ ও ইন্ধনদাতাদের গ্রেপ্তার করতে প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এ অবস্থায় গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে জোট-মহাজোটের নেতাসহ পুরুষরা।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন বড়তল্লা গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের প্রধান সড়কে লোকজনের চলাচল নেই। রাস্তার মোড়ের বিভিন্ন দোকানপাট, বড়তল্লা বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। জোহরের আজান দিলেও মসজিদে মুসল্লিদের আগমন নেহাত কম।

আবু সামা নামে প্রান্তিক কৃষক বলেন, কয়েকটি গরু প্রতিপালন ও সামান্য জমি চাষ করে তার সংসার চলে। পুলিশের ভয়ে গরুগুলোর তিনি খাবার-দাবার দিতে পারছেন না। কিছুদিনের মধ্যে জমির ধান কাটতে হবে। ধান কীভাবে বাড়িতে আনবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

আনোয়ার হোসেন নামে এক শিক্ষক কাদামাখা পায়ে এসে জানান, পুলিশ ভেবে তিনি ডোবা পার হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, একে তো করোনায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তার ওপর পুলিশের আতঙ্কে রাতে বাড়িতে থাকতে পারছেন না। ফলে মানসিকভাবে হতাশ হয়ে পড়ছেন তিনি।

ইয়াছিন মিয়া বলেন, সংঘর্ষ ও পরে গ্রেপ্তার আতঙ্কে তার মাঠের পাকা ধান, পোলট্রি ব্যবসা ধ্বংস হতে চলেছে। বাড়িতে থাকতে না পারায় মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তিনি।

কুমকুম নামে এক নারী বলেন, বাড়িতে পুরুষ মানুষ নেই, তারা বাড়িতে আসতে না পারায় বাজার করা বন্ধ। তাই অনেক দিন পানি খেয়েই সেহরি ও ইফতার করতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বয়স্ক নারী বলেন, তার ছেলের দোকান বন্ধ। তা সংসারটা কীভাবে চলবে তা ভাবতে পারছেন না তিনি।

মাহবুব নামে এক রাজমিস্ত্রি ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কিছু উঠতি বিত্তশালী, প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতার ইন্ধনে আজ গ্রামের এ দুরবস্থা।

এ ব্যাপারে আশুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সালাহ উদ্দিন বলেন, সমস্যা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হানিফ মুন্সি বলেন, উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে ধান কাটা ও মাঠের ফসল ঘরে আনার ব্যবস্থা করা হবে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আশুগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে আশুগঞ্জ থানার ওসি জাবেদমাহমুদ বলেন, বড়তল্লায় বিভিন্ন সময় সংঘর্ষের ঘটনায় দুটি পুলিশ অ্যাসল্ট মামলাসহ একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।

মন্তব্য করুন