চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চন্দ্রঘোনা-কদমতলী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড দোভাষী বাজারের মিশন এলাকায় রয়েছে ত্রিপুরা সুন্দরী নামে একটি প্রাকৃতিক ছড়া। ছড়াটি দখল করে গড়ে উঠেছে একাধিক বহুতল ভবনসহ শতাধিক নানা স্থাপনা। এমনকি ছড়া-সংলগ্ন খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতালের বিস্তীর্ণ জায়গাও প্রভাবশালীদের দখলের থাবা থেকে রেহাই পায়নি। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই ছড়ার পানি উপচে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

স্থাপনা উচ্ছেদে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক নোটিশ দেওয়া হলেও দখল প্রক্রিয়া থামানো যাচ্ছে না। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি জেলা পর্যায়ে সরকারিভাবে ছড়া উদ্ধারে উচ্ছেদ কমিটি করেও ছড়াটি উদ্ধার করা যায়নি। প্রাকৃতিক এই ছড়া রক্ষায় সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ত্রিপুরা সুন্দরী ছড়াটি চন্দ্রঘোনা মিশন এলাকার মধুছড়ি থেকে শুরু হয়ে কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিশেছে। একসময়ে প্রবহমান এই ছড়াটিই ছিল এ অঞ্চলের পানি নিস্কাশনের একমাত্র মাধ্যম। কয়েক যুগ আগে থেকেই প্রভাবশালীদের নজর পড়ে এই ছড়ার ওপর। একটি দুটি করে ছড়ার ওপর গড়ে উঠেছে বহুতল ভবনসহ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা। এসব ভবনের ফলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে ছড়াটি। পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে সামান্য বৃষ্টিতে পানি উপচে পড়ে দোভাষী বাজার কাদায় একাকার হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছড়ার উৎপত্তি অংশে রয়েছে চন্দ্রঘোনা মিশন এলাকা। ওই স্থানেও ছড়াটি দখল করে গড়ে উঠেছে নানা স্থাপনা। নিচের অংশে চন্দ্রঘোনা দোভাষী বাজারের মাছ বাজার থেকে শুরু করে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত এই ছড়ার বিস্তীর্ণ জায়গা দখল হয়ে গেছে। গড়ে উঠেছে সেবা প্যাথলজি, আবদুল্লাহ ভবন, চন্দ্রঘোনা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন মার্কেট, ক্লিনিক, পাইকারি সবজি মার্কেট, বাসা-বাড়ি, দোকানসহ শতাধিক স্থাপনা। এসব স্থাপনার ফলে কয়েক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ছড়াটির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

কথা হয় আবুল হোসেন (৭০) নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি জানান, ত্রিপুরা সুন্দরী নামের এই ছড়া দিয়ে এক সময় পানি প্রবাহিত হতো। চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান থেকে শুরু করে আশপাশের এলাকার নিস্কাশিত পানি এই ছড়া দিয়েই প্রবাহিত হয়ে কর্ণফুলীতে যেতো। কিন্তু ছড়াটি এখন সম্পূর্ণরূপে দখল হয়ে বিলীন হয়ে গেছে। এতে এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় বলে তিনি জানান।

ছড়ার পাশে ভবন নির্মাণ করতে দেখা যায় ডা. সঞ্জয় দে নামের এক ব্যক্তিকে। তিনি বলেন, ছড়ার জায়গা খালি রেখেই ভবন নির্মাণ করছি। আমার দুই পাশে ছড়ার ওপর ফাউন্ডেশন দিয়ে গড়ে উঠেছে একাধিক বহুতল ভবন। আমার জায়গার পাশেই ছড়ার সামান্য অংশ এখনও দৃশ্যমান। এর বাইরে দীর্ঘ দুই কিলোমিটারের মধ্যে ছড়ার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ছড়ার পাশে গড়ে ওঠা চন্দ্রঘোনা জেনারেল হাসপাতাল ও সেবা প্যাথলজির পরিচালক ডা. এস এম কাউছার বলেন, এই ভবন দুটি ছড়ার জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে কিনা জানা নেই। যদি ছড়ার ওপর নির্মিত হয়েও থাকে তবে শুধু এই ভবনগুলোই নয়, একই লাইনে একাধিক স্থাপনা রয়েছে। অন্যান্য স্থাপনা উচ্ছেদ হলে আমাদেরটাও হবে।

চন্দঘোনা খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতালের পরিচালক ডা. প্রবীর খিয়াং বলেন, দখলদাররা শুধু ছড়াই নয়, খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতালের জায়গাও দখলে নিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণসহ নানা স্থাপনা গড়ে তুলেছে। এসব অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

এ বিষয়ে চন্দ্রঘোনা-কদমতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিছ আজগর বলেন, শুধু দোভাষী বাজার নয়, ছড়ার উৎপত্তিস্থল কাপ্তাইয়ের মধুছড়ি থেকেই এই ছড়াটি দখল হয়ে গেছে। এটি দখলমুক্ত করে পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে যাবতীয় সহযোগিতা করা হবে।

ত্রিপুরা সুন্দরী ছড়া দখলের বিষয়টি জানা নেই উল্লেখ করে ইউএনও মাসুদুর রহমান বলেন, কোনো খাল কিংবা ছড়া দখল করা আইনের পরিপন্থি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয় : ছড়া দখল করে স্থাপনা

মন্তব্য করুন