দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মানুষ। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে-

বাউফল :জেসমিন বেগম (৪০)। বিয়ে হয়েছে ২৫ বছর আগে। বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজন পুকুর ভরা মাছ, গোয়ালে গরু, চাষাবাদের জমি দেখে তাকে বিয়ে দেন। চোখের সামনে ভেসে গেছে শ্বশুরের স্বপ্নের ভিটেমাটি, ফসলি জমিসহ অন্যান্য সম্পদ। পটুয়াখালীর বাউফলের কারখানা নদীর ভাঙনের কবলে পড়তে হয়েছে তিনবার তার পরিবারকে। সহায়-সম্বল হারিয়ে জেসমিন তার তিন সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন পাকডাল কাছিপাড়ার এক আত্মীয়ের জমিতে। কারখানা নদী তাও গিলে খেয়েছে। সর্বস্ব হারিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন কাছিপাড়া সড়কের পাশে। তিনি বলেন, সর্বনাশা নদী তাদের পথের কাঙাল বানিয়েছে। আগে যেখানে জমি ও বাড়ি হারিয়েছেন, সেখানে নতুন চর জেগে উঠেছে, কিন্তু তা প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে।

কাছিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তালুকদার, কনকদিয়ার চেয়ারম্যান শাহিন হাওলাদার ও বগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহমুদ হাসান বলেন, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির তীব্রতায় প্রায় আটটি গ্রাম বিলীনের দ্বারপ্রান্তে। এ তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ৮-৯ হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে বিভিন্ন স্থানে জীবনযুদ্ধ করে চলছে। এ বিষয়ে তারা একাধিকবার উপজেলা পরিষদের উন্নয়ন সভায় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। কিন্তু ভাঙন রোধে তীর রক্ষায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা। এ বিষয়ে ইউএনও জাকির হোসেন জানান, বর্ষা মৌসুমে প্রচণ্ড জোয়ারের কারণে এ তিনটি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীতীর ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জানাবেন।

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হালিম সালেহী জানান, কাছিপাড়া, কনকদিয়া ও বগার ভাঙনের বিষয়ে অবগত। সরেজমিন গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

গজারিয়া (মুন্সীগঞ্জ) :বর্ষায় পানি বৃদ্ধির কারণে স্রোতের টানে গজারিয়ার বৈদ্যারগাঁও এলাকার খালের তীরবর্তী পাঁচটি বসতবাড়ি ভাঙনের কবলে পড়েছে। খালপাড়ের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিনশেড ভবন পড়েছে হুমকির মুখে।

স্থানীয় ও ভাঙনকবলিত পরিবার সূত্রে জানা যায়, টেংগারচর ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বৈদ্যারগাঁও গ্রামের প্রয়াত আবদুল করিম পণ্ডিতের বাড়ির দক্ষিণ পাশের খালে বর্ষা মৌসুমের পানির স্রোতের টানে গত মঙ্গলবার থেকে তীরবর্তী কয়েকটি বসতবাড়ি ভাঙনের মুখে পড়ে। স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে বসতভিটা রক্ষার জন্য বাঁশ ও বালুভর্তি বস্তা ফেলে প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন।

ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বুলু মিয়া, মজিবুর রহমান, ফজলুল হক, ফারুক মিয়া ও প্রতিবন্ধী শাহিন জানান, তারা বসতভিটা বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় নির্ঘুম রাত অতিবাহিত করছেন।

উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বৈদ্যারগাঁও খালের তীরবর্তী একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের হুমকির মধ্যে রয়েছে। ওই বিদ্যালয়ের নতুন স্থাপনা নির্মাণের বরাদ্দ পাওয়া গেলেও জমি নিয়ে জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ শুরু করা যাচ্ছে না।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মমতাজ বেগম জানান, স্কুলের দক্ষিণ পাশের খালের ভাঙন থেকে প্রতিষ্ঠান রক্ষার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাজেট রয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই কাজ শুরু করা হবে।

রাজবাড়ী :পদ্মা নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ চলার মধ্যেই রাজবাড়ী সদরের গোদারবাজার এলাকায় দুটি স্থানে প্রায় ৬০ মিটার এলাকার ব্লক ধসে ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। সঠিকভাবে কাজ হলে এ ভাঙন সৃষ্টি হতো না বলে মনে করছেন তারা।

সরেজমিনে জানা যায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় ভাঙন। ভাঙনে নদীতীরের ব্লকগুলো ধসে পানিতে তলিয়ে গেছে। নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে। গোদারবাজার এলাকার নদীর তীরে এনজিএল ইটভাটার সামনে প্রায় ১০ মিটার এলাকা এবং সেখান থেকে আনুমানিক ৭০ মিটার দূরে আরেকটি স্থানে প্রায় ৫০ মিটার এলাকা ধসে গেছে।

নদীভাঙনস্থলে তদারকের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিজের সুপারভাইজার রায়হান শেখ দাবি করেন, কাজের কোনো সমস্যা ছিল না। তবে তারা যেভাবে কাজ করতে চেয়েছিলেন, সেভাবে তাদের সরবরাহ করা হয়নি। এখন ভাঙন রোধে ছয় ফুট লম্বা দেড় ফুট চওড়া জিও টিউব ফেলা হবে। এতে ভাঙন প্রতিরোধ করা যাবে।

রাজবাড়ী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ বলেন, ভাঙন রোধে মঙ্গলবার রাত থেকে জিও ব্যাগ ফেলা শুরু হয়েছে। জিও ব্যাগের পাশাপাশি জিও টিউবও ফেলা হবে। আশা করছি, ভাঙন প্রতিরোধ করা যাবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাজের

মেয়াদকাল শেষ হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমাদের কাজ বুঝিয়ে দিতে চাইলেও আমরা গ্রহণ করিনি। কাজ টেকসই করতে হলে আরও জিও ব্যাগ ফেলা দরকার।

দশমিনা (পটুয়াখালী) :দশমিনার বাঁশবাড়ীয়া লঞ্চঘাট থেকে বাউফলের বগী বাজার পর্যন্ত তিন কিলোমিটার বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। বাঁশবাড়ীয়া ও বহরমপুর ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন।

অবিরাম বর্ষণ, তেঁতুলিয়া নদীর পানি চার-পাঁচ ফুট বৃদ্ধি ও প্রবল ঢেউয়ে প্রতিদিন বেড়িবাঁধের ওই এলাকা ভাঙছে। ভাঙনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে ১২ ফুট চওড়া বাঁধের কোনো কোনো স্থানে বেড়িবাঁধের অংশে এক-দেড় ফুট ছাড়া বাকি অংশ এরই মধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

বাঁশবাড়ীয়া লঞ্চঘাট এলাকার ইউপি সদস্য কবির হোসেন জানান, বেড়িবাঁধের ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যে কোনো মুহূর্তে বেড়িবাঁধের বাকি অংশটুকু ভেঙে লোকালয়ে তেঁতুলিয়া নদীর পানি ঢুকে পড়তে পারে।

পটুয়াখালী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সালেহ আহমেদ জানান, বাঁশবাড়ীয়া লঞ্চঘাট থেকে ৩০০ মিটার বেড়িবাঁধ ভাঙন প্রতিরোধে সংস্কারের প্রস্তাবনা রয়েছে।

মন্তব্য করুন