কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় গৃহহীনদের দেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুর্যোগ সহনীয় অর্ধশতাধিক ঘর পানিতে ডুবে গেছে। সীমান্তের বেড়িবাঁধে স্লুইসগেট বন্ধ থাকায় টানা বৃষ্টির পানি জমে ঘরগুলো ডুবে যায়। বিলের মাঝখানে নির্মাণ করায় এ ঘরগুলো বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় অন্য জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে দরিদ্র পরিবারগুলো।

সরেজমিন দেখা গেছে, টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের মৌলভীবাজার থেকে পূর্ব দিকে দেড় কিলোমিটার ভেতরে সীমান্ত সড়কের কাছাকাছি সরকারি উদ্যোগে ২০২০-২১ অর্থবছরে মুজিব শতবর্ষে 'ভূমিহীন ও গৃহহীন' অর্থাৎ 'ক' শ্রেণির দুর্যোগ সহনীয় ২৮টি টিনশেড পাকা ঘর পানিতে ডুবে গেছে। সেখানে চার-পাঁচটা পরিবার ছাড়া সবাই অন্য স্থানে চলে গেছে। এ ছাড়া একই ইউনিয়নে ওয়াব্রাংয়ে ২৮টি টিনশেড ঘর পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় রয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, মুজিববর্ষে ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারের জন্য মোট ২২৯টি ঘর বরাদ্দ পাওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয় ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। তবে দুই দফায় ৮০টি পরিবারকে ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের সব কাজ শেষে সুবিধাভোগীদের ঘর বুঝিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে।

মৌলভীবাজারে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে পানিবন্দি সমিরা বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, দু'দিন ধরে পানিবন্দি রয়েছি। স্বজনদের কাছ থেকে নৌকায় করে খাবার নিয়ে এসে খেতে হচ্ছে। কেউ সহায়তা দিতে আসেনি। এখানে ২৮টি পরিবারের মধ্যে তারাসহ চার পরিবার ছাড়া বাকিরা অন্য জায়গায় চলে গেছে। তাদের কোনো স্বজন না থাকায় পানিবন্দি থাকার পরও কোথাও যাওয়ার জায়গা পাচ্ছেন না। মূলত এই এলাকায় কিছু সুবিধাভোগী লোক বেড়িবাঁধের স্লুইসগেট বন্ধ করে রাখায় তারা সবাই পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া সরকার তাদের যেখানে ঘর দিয়েছে, সেটি অনেক নিচু এলাকা।

পরিবারের সদস্যদের অন্য স্থানে পাঠিয়ে দিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পাহারা দিচ্ছিলেন সৈয়দ আলম ওরফে লালু। তার ভাষ্য মতে, সরকারের দেওয়া একটি ঘরই তার সম্বল, তাই পরিবারের নারী সদস্যদের অন্য স্থানে পাঠিয়ে দিয়ে এখানে অবস্থান করছেন। অনেকেই অন্য জায়গায় চলে গেছেন। পানি ঢোকার কারণে দু'দিন ধরে ঘরে চুলা জ্বালাতে পারেননি তারা। এখানে পানি ও খাবারের ব্যবস্থা নেই। তাই ভীষণ কষ্টে দিন কাটছে তাদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হ্নীলা ইউনিয়নের আবুল কালাম, সাবের, সৈয়দুল আমিন ও হোসেন বলীসহ একটি সুবিধাভোগী লবণচাষি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত সড়কের বেড়িবাঁধের স্লুইসগেট বন্ধ করে রাখে। তারা এলাকার খারাংখালী, মৌলভীবাজার, ওয়াব্রাংয়ের চারটি স্লুইসগেট বন্ধ করে দেয়। ফলে দু'দিনের বৃষ্টিতে এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আমিন হোসেন জানান, কয়েকজন অসাধু লবণচাষির জন্য তাদের পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পাঁচ শতাধিকের বেশি মানুষ এখনও পানিবন্দি দিন কাটাচ্ছেন। তাদের খাবার পানিসহ নিত্যপ্রয়োজনী দ্রব্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে হ্নীলায় ওয়াব্রাংয়ে ভূমিহীন-গৃহহীনদের জন্য তৈরি প্রধানমন্ত্রীর ঘরগুলো পানিতে ডুবে গেছে। সেখানকার সব ঘরই খালি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে ঘর বরাদ্দ পাওয়া মোহাম্মদ আক্কাস নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ঘরের জমি নির্ধারণকালে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকবার নিষেধ করে বলেছেন যে, এটি নিচু জায়গা, এ স্থান ঘর করার উপযোগী নয়। কিন্তু তার কথা কেউ শোনেননি।

আক্কাস জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার এই এলাকায় বসতি। ফলে ধারণা ছিল এখানে ঘর নির্মাণ করলে বৃষ্টিতে তলিয়ে যাবে এবং তা-ই হয়েছে।

হ্নীলা ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী জানান, বেড়িবাঁধের স্লুইসগেটের অভাবে তার এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের ঘরও রয়েছে। তবে বৃষ্টি থেমে যাওয়ার কারণে পানি কমে যাচ্ছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সিফাত বিন রহমান বলেন, টেকনাফে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ায় অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এজন্য গ্রামের অন্য ঘরগুলোর সঙ্গে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোও ডুবে গেছে। পানি নেমে গেলে ঘরগুলোর বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরগুলো ইতোমধ্যে পরিদর্শন করেছেন উল্লেখ করে টেকনাফের ইউএনও পারভেজ চৌধুরী বলেন, সীমান্ত সড়কে বেড়িবাঁধের স্লুইসগেটের যে সমস্যা ছিল সেটি সমাধানের কাজ চলছে। কারা স্লুইসগেট বন্ধ রাখছে সে বিষয়ে খতিয়ে দেখা হবে।

জেলা প্রশাসক মামুনুর রশিদ বলেন, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য সীমান্ত সড়কের বেড়িবাঁধের স্লুইসগেটের বিষয়ে তারা কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরগুলোর ব্যাপারেও খোঁজ রাখছেন।

মন্তব্য করুন