হাসিমাখা শৈশব পেরোনো রবিউল এখন মাটির গর্তে শিকলে বন্দি। প্রায় দেড় যুগ ধরে এমন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। সামান্য জ্বর থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন এই যুবককে নিয়ে দিশেহারা হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে তার

নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। মায়ের কান্না, বাবার চিন্তা কোনো কিছুই স্পর্শ করে না তাকে। পরিবারের অসহায়ত্বে অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে গেছে একটি জীবন। এমন অবস্থায় শিকলবন্দি রবিউলের পরিবারকে সহযোগিতা এবং তার চিকিৎসার ভার নিয়েছেন ইউএনও এবং ওসি।

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ময়না ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম চরবর্ণি গ্রামের ভ্যানচালক মো. নুরুল মোল্যার ছেলে মো. রবিউল মোল্লার বয়স ৩৫ বছর। তিন ভাইয়ের মধ্যে রবিউল বড়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় ১৮ বছরের শিকলবন্দি জীবনে ঘরটির মাটির গর্ত হাত দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে রবিউল নিজেই তৈরি করেছেন নিজের থাকার জগৎ। রবিউলের হাতের নখ ও আঙুল ব্যবহার করে তৈরি গর্তটি একটি গোলাকার বাঙ্কারেই রূপ নিয়েছে।

রবিউলের মা আসমানী বেগম বলেন, রবিউলের বয়স তখন প্রায় ১০ বছর। সে সময় তার জ্বর হয়েছিল। অসুস্থতার কয়েক বছর পর ধীরে ধীরে তার হাত-পা শুকিয়ে যেতে থাকে। পরিবারের সাধ্যমতো কবিরাজ ও চিকিৎসক দেখানো হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেনি সে। শীত-গরম কোনো অনুভূতিই বোঝে না সে। শরীরে তাই কখনোই কাপড় রাখে না রবিউল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, 'পাগল হয়েছে বলে ছেলেডারে

মাইরে ফেলিনি। যেভাবেই হোক ওরে বাঁচাই রাখছি। এখন আল্লাহ ওরে যতদিন দুনিয়ায় রাখে। সন্ধ্যা হলে আমি আর অন্য ঘরে থাকতি পারি না, ছেলের জন্য মন কান্দে।'

রবিউলের বাবা মো. নুরুল মোল্লা বলেন, 'রবিউল অসুস্থ হওয়ার পর তার ওজনের সমান টাকা ফেলেও তারে আর ভালো করতে পারিনি। আমার যা ছিল, ওর চিকিৎসা করতে গিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। পরে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিছি।' তিনি জানান, শিকল খুলে দিলে রবিউল পুরো বাড়ি ভাঙচুর ও উল্টাপাল্টা করে। এদিক ওদিক হারিয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে মনে না মানলেও প্রায় ১৮ বছর ধরে ওকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছি।

রবিউলের ছোট ভাই ইমরান মোল্লা বলেন, ছোট বেলায় বড়ভাই আমাকে সাইকেল চালানো শিখিয়েছিল। সে স্মৃতি আমি এখনও ভুলিনি। এখনও আশা ছাড়িনি যে ভাই সুস্থ হবে না।

রবিউলের বিষয়টি জানতে পেরে ইউএনও ঝোটন চন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে মানসিক ভারসাম্যহীন রবিউলের চিকিৎসায় বড় ধরনের অর্থ সহায়তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার প্রস্তুতি চলছে।

গতকাল শনিবার দুপুরে শিকলবন্দি রবিউলকে দেখতে যান ওসি মোহাম্মদ নুরুল আলম। তিনি বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে রবিউলকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করা হবে এবং তার উন্নত চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করা হবে।

মন্তব্য করুন