খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার গৃহহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি অর্থয়ানে নির্মিত হলেও হতদরিদ্রদের কাছ থেকে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। ঘর নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের সামগ্রী।

উপজেলার গোমতি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন লিটনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনেছে ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, ঘরের বরাদ্দ পেতে চেয়ারম্যানকে টাকা দেওয়ার পরও ঘরে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি ঘরে ৪৫ কেজি করে রড বরাদ্দ থাকলেও দেওয়া হয়েছে গ্যালবানাইজড আয়রন (জিআই) তার! লোহার রড ছাড়াই নিম্নমানের ঘর বানিয়েছেন চেয়ারম্যান। আশ্রয়ণ প্রকল্পে এমন দুর্নীতির অভিযোগে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

গৃহহীনদের ঘর বরাদ্দের তালিকায় নাম থাকার পরও চেয়ারম্যানের দাবি অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকা দিতে না পারায় ঘর পাননি দিনমজুর আবু তাহের। এ নিয়ে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। আবু তাহের বলেন, ঘর বরাদ্দের উপকারভোগীর তালিকায় তার নাম ছিল এক নম্বরে। কিন্তু ঘর পেতে চেয়ারম্যান তাকে ৫০ হাজার টাকা দিতে বলেন। তিনি টাকা দিতে না পারায় তার নামে বরাদ্দ ঘর ইসমাইল হোসেন নামে এক প্রভাবশালীকে বরাদ্দ দিয়েছেন চেয়ারম্যান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর বরাদ্দ পান গোমতি ইউনিয়নের শান্তিপুর এলাকার বাসিন্দা মালেকা বেগম। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ঘরের বরাদ্দ পাওয়ার জন্য তার কাছে গোমতি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন লিটন ৫০ হাজার টাকার দাবি করেন। তিনি ধার-দেনা করে চেয়ারম্যানকে ২৫ হাজার টাকা দেন। এরপর তাকে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। রমজান মাসের আগে থেকে ঘরের কাজ বন্ধ। এখনও ফ্লোর করা হয়নি, টয়লেট বসায়নি।

শান্তিপুর এলাকার বাসিন্দা ফুল মিয়া ও সেলিনা বেগম। এই দম্পতিও ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর বরাদ্দ পান। তবে ঘরের বরাদ্দ পেতে তারা চেয়ারম্যানকে দিয়েছেন ২৫ হাজার টাকা। এই দম্পতি জানান, ঘরের বরাদ্দ পাওয়ার জন্য চেয়ারম্যান তাদের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে গরু বিক্রি করে তারা চেয়ারম্যানকে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। অথচ তাদের ঘরে কোথাও রড ব্যবহার করা হয়নি। শুধু জিআই তার দিয়েছেন। সাত বস্তা বালুর সঙ্গে এক বস্তা সিমেন্ট দিয়েছেন। মিস্ত্রিরা বালু বেশি দিয়েছেন।

একই গ্রামের বাসিন্দা আনু মিয়া বলেন, তিনি ঘরের জন্য চেয়ারম্যানকে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছেন। তার ঘরের কাজ এখনও শেষ হয়নি। ঘরে কোনো রড ব্যবহার করা হয়নি।

গোমতি বাজার এলাকার বাসিন্দা আজমেহের জানান, ঘরের কাজ এখনও শেষ হয়নি; কিন্তু পিলার ভেঙে পড়ে গেছে। ঘরের ভেতর কোনো রড দেয়নি। ঘরের কাজ বন্ধ প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গোমতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন লিটন বলেন, 'আমি টাকা নিইনি। টাকা নিতে যাব কেন, এটা তো প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর। ঘরের কাজ ভালো করার জন্য যা যা করা দরকার করেছি।' ঘরে জিআই তার ব্যবহার প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, 'তার দিয়ে ছাউনির কাঠ বাঁধা হবে। পিলারে কোনো রড বরাদ্দ না থাকায় জিআই তার দিয়েছি।' চেয়ারম্যান দাবি করেন, রড বরাদ্দ নেই, ঘর শুধু ইটের ওপর থাকবে।

মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হেদায়েত উল্লাহ জানান, তিনি এখানে তিন দিন আগে দায়িত্ব নিয়েছেন। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বিষয়ে ইতোমধ্যে বেশকিছু অনিয়মের অভিযোগের ব্যাপারে শুনেছেন। এখনও কিছু ঘরের কাজ চলমান আছে। এ বিষয়ে তারা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরগুলো যে মানে নির্মিত হওয়ার কথা, সেই মানে নির্মিত হতে হবে। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না।

মন্তব্য করুন