'আমরা মেয়ে লোক, পুরুষগো সমান নাকি কাজ করতি পারিনে, তাই আমাগো জোনের দাম (মজুরি) কম'- আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বললেন শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ জেলেখালী গ্রামের ডাক্তারপাড়ার সুশীলা রানী সরকার। ত্রিশোর্ধ্ব এ নারী শ্রমিক আরও বলেন, 'ন্যায্য জোনের দাম চালি (দাবি করলে) আমাগো আর কাজে নেয় না।'

হরিপুর গ্রামের বিধবা নারী শ্রমিক সুফিয়া বেগমের দাবি, একসঙ্গে কাজ শুরু করে আবার একসঙ্গে শেষও করেন। তার পরও তাদের জোনের দাম পুরুষের অর্ধেক। তবে শুধু জেলেখালীর সুশীলা সরকার বা হরিপুরের সুফিয়া বেগম নন, উপকূলবর্তী জনপদ শ্যামনগরসহ আশপাশের এলাকায় সব নারী শ্রমিকই মজুরিবৈষম্যের শিকার।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্ব হারানো অসংখ্য পরিবার দৈনন্দিন কাজের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় জটিলতা আরও বেড়েছে। পুরুষের সঙ্গে সমানতালে শ্রম দিয়েও মজুরির ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য মানসিকভাবে তাদের হতাশাগ্রস্ত করে তুলেছে।

উপজেলার সরদার গ্যারেজ এলাকার মনীষা সরদার, জেলেখালীর দীপা রানী মণ্ডল ও গীতা রানী বর্মণ জানান, ধানক্ষেতে নিড়ানির কাজে পুরুষ শ্রমিকদের এক বেলায় ৩৫০ টাকা দিতে হবে। বাধ্য হয়ে স্থানীয় মহাজন ও জমির মালিকরা একই কাজে নারীদের নিযুক্ত করে দেড়শ থেকে দুইশ টাকা হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে। কাদাপানির মধ্যে কাজের জন্য পুরুষের সমান না হলেও মজুরি কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানালে অগত্যা পুরুষ শ্রমিকদের কাজে লাগানোর হুমকি দেয় তারা।

সুন্দরবন সংলগ্ন কদমতলা গ্রামের শাহানাজ বেগম, মুন্সিগঞ্জের কবিতা মণ্ডল, অমেলা গায়েনসহ অন্যরা জানান, মাটি কাটা থেকে শুরু করে ধান রোপণ সব কাজে নারী শ্রমিকদের কাজের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এসব নারী শ্রমিক পুরুষের সমান পরিশ্রম করার পরও তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

নারীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন প্রেরণার নির্বাহী পরিচালক শম্পা গোস্বামী জানান, নারী শ্রমিকদের মজুরিবৈষম্য কমানোর অংশ হিসেবে প্রতিনিয়ত তাদের নিয়ে বৈঠকসহ বিভিন্নভাবে সচেতন করার চেষ্টা চলছে। তবে নারী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নসহ তাদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে কর্মরত পুরুষ শ্রমিকসহ পুলিশ ও জনপ্রশাসন এবং সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সচেতন হতে হবে।

জাতীয় মহিলা পরিষদ শ্যামনগর উপজেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক শাহানা হামিদ জানান, মাঠ পর্যায়ে কর্মরত নারী শ্রমিকরা এখনও মারাত্মকভাবে বৈষম্যের শিকার। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকা রাখার বিষয়ে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগী হতে হবে।

মন্তব্য করুন