বীরগঞ্জে কৃষিঋণ নিয়ে শত শত কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা করেছে সোলারগাঁও এগ্রো ইঞ্জিনিয়ার্স এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কৃষকদের নামে সাড়ে ৭ কোটি টাকা ঋণ পাস করিয়ে সেই টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি কয়েকজন কৃষক ও পাম্প অপারেটর তাদের বিরুদ্ধে বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রশাসক বরাবর একটি অভিযোগ দিয়েছেন। এই ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেছেন ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট সোলারগাঁও এগ্রোর ম্যানেজার।

জেলার বীরগঞ্জ, কাহারোল, বিরল, খানসামা, বোচাগঞ্জ ও পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার কয়েকজন কৃষক জানান, সোলারগাঁও এগ্রো ইঞ্জিনিয়ার্স এন্টারপ্রাইজ ব্যাংক এশিয়ার মাধ্যমে কৃষি ঋণ দেওয়ার কথা বলে গোপনে তাদের নামে নতুন সিম রেজিস্ট্রেশন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করে। এ সময় কৌশলে তাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হয়। ওই সিমটি সোলারগাঁও এগ্রো নিজ হেফাজতে রাখে। এভাবে প্রায় ২ হাজার ২০০ কৃষকের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয় এবং ঋণ প্রস্তাব করা হয়। কৃষক প্রতি ৫০ হাজার টাকা করে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা কৃষকের জন্য ঋণ বরাদ্দ হয়। কিন্তু দেওয়া হয় ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা করে। যার পরিমাণ প্রায় ৬০ লাখ। এর মধ্যে আবার অনেকেই এ টাকাও পাননি। কেননা ঋণ প্রস্তাবের পর অনুমোদনের মেসেজ কৃষকদের ব্যবহূত নম্বরে না গিয়ে নতুন মোবাইল নম্বরে চলে যায়। এদিকে টাকা না নিলেও অনেক কৃষকের কাছে মেসেজ আসছে ৫০ হাজার টাকা ঋণ শোধ করার জন্য। এর প্রতিবাদ করায় ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট সোলারগাঁও এগ্রো ইঞ্জিনিয়ার্স এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের আটজন ঋণ বিতরণ ও আদায় কর্মকর্তাকে (কালেকশন অ্যান্ড লোন রিকভারি অফিসার) চাকরিচ্যুত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

কাহারোল উপজেলার উত্তর নওগাঁ গ্রামের ডিপ অপারেটর সমারু মালাকার বলেন, ২০২০ সালে সোলারগাঁও এগ্রো সেচ পাম্পের অপারেটর হিসেবে চুক্তিতে আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে কোম্পানি কৃষকদের কৃষিঋণ দেওয়ার কথা বলে আমার মাধ্যমে স্থানীয় ৮০ জন কৃষকের তালিকা নেয়। কোম্পানির লোকজন জানায়, ৮০ জনের মধ্যে ১০ জনের ১০ হাজার টাকা করে ঋণ মঞ্জুর হয়েছে। এদিকে যারা ঋণ পেয়েছেন তারা এরই মধ্যে তা পরিশোধও করেছে। কিন্তু এখন অনেকের মোবাইলে মেসেজ আসছে যে তাদের ৫০ হাজার টাকা করে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এখন সব কৃষক আমাকে ধরছে। অথচ এখানে আমার কোনো দোষ নেই।

একইভাবে কাহারোলের শংকরপুর গ্রামের পাম্প অপারেটর জুয়েল ইসলামের মাধ্যমে ৬০ জন, মাধবগাঁও গ্রামের পাম্প অপারেটর যতীশ চন্দ্র রায়ের মাধ্যমে ৯০ জন, রসুলপুর গ্রামের পাম্প অপারেটর রহিদুল ইসলামের মাধ্যমে ৩০ জনসহ পাম্প অপারেটরদের মাধ্যমে কয়েকশ কৃষকের নামে ঋণ প্রস্তাব করে কোম্পানিটি। এর প্রতিবাদ করলে চলতি বছরের ১৯ আগস্ট কালেকশন অ্যান্ড লোন রিকভারি কর্মকর্তা পদ থেকে জান মোহাম্মদ জীবন, শামীম ইসলাম, বিল্লাল আলী, আল মামুন ও নুরুল ইসলামকে চাকরিচ্যুত করে সোলারগাঁও এগ্রো। এর আগে এক সঙ্গে আব্দুল্লাহ আল মামুন, ফাতাউর ইসলাম ও আবুল বাসার নামে তিন কর্মকর্তাকেও চাকরিচ্যুত করা হয়।

বীরগঞ্জের নিজপাড়ার হাবিবুর রহমান জানান, তিনি ১৫ হাজার টাকা ঋণ পেয়ে তা পরিশোধও করেছেন। কিন্তু এই ঝামেলা হওয়ার পর ব্যাংক স্টেটমেন্ট নিয়ে দেখেন যে তার নামে করা অ্যাকাউন্টে এক লাখ ২ হাজার টাকা লেনদেন হয়েছে। এখন তার আশঙ্কা যে টাকা নেননি সেটি না আবার পরিশোধ করতে হয়।

চাকরিচ্যুত বিল্লাল আলী বলেন, ১৩টি পাম্পে তার অধীনে সাড়ে ৫০০ কৃষক ছিলেন। কেউ ৫ হাজার আবার কেউ ১০ হাজার টাকা করে ঋণ পেয়েছেন। তারা ঋণ পরিশোধ করেছে। বেশিরভাগ কৃষককেই কোনো ঋণ দেওয়া হয়নি। এখন তাদের ফোনেও ঋণ পরিশোধের মেসেজ আসছে। এসবের প্রতিবাদ করায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট সোলারগাঁও এগ্রো ইঞ্জিনিয়ার্স এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার বুলবুল ইসলাম বলেন, আমরা ১৮২ জন কৃষককে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দিয়েছি। কৃষকরা যে অভিযোগ করছেন তা মিথ্যা। তারা কেন এই অভিযোগ করছেন তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে কতজনের কাছ থেকে ঋণের আবেদন নেওয়া হয়েছে তা জানাতে পারেননি তিনি।

ম্যানেজার বুলবুল ইসলামের দাবি, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এরপর থেকে ওই কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। প্রশাসন কাগজপত্র দেখতে চেয়েছে। সময়মতো সেগুলো দেওয়া হবে।

ব্যাংক এশিয়া দিনাজপুর শাখার ব্যবস্থাপক চঞ্চল কুমার বলেন, অভিযোগ পেয়ে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।

বীরগঞ্জের ইউএনও আব্দুল কাদের বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কৃষকদের মামলা করতে বলা হয়েছে। তাদের পাশে থাকবে প্রশাসন। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কতজন কৃষক প্রতারণার শিকার হয়েছে তা নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। এ কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু রেজা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, শিগগির তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন