'কত না হাজার ফুল ফোটে ভুবনেতে,/তার কিছু ফুল দিয়ে গাঁথা হয় মালা,/বাকি ফুল ফোটে অনাদরে ঝরে যেতে।' গানের এ কথাগুলো যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে ভ্যানচালক দরিদ্র কবি আবু সাইদ খানের জীবনে। প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন না পেয়ে অনাদরেই ঝরে পড়েছেন তিনি। আবু সাইদ খান দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ডাংধরা ইউনিয়নের জোয়ানেরচর গ্রামের মৃত আরমান খানের ছেলে। তার বয়স ৬৫ বছর।

ভ্যানচালক হলেও তিনি ভেতরে ধারণ করে আছেন এক অসাধারণ প্রতিভা। দারিদ্র্যের কারণে বেশি দূর লেখাপড়া হয়নি তার। ১৯৬৯ সালে পঞ্চম শ্রেণি পাস করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা স্বল্প হলেও আবু সাইদ খান মেধা ও মননে শৈল্পিক চেতনায় উজ্জ্বল এক ব্যক্তি। তিনি একটি সুবিশাল ও অসাধারণ কাব্য রচনা করেছেন। কাব্যটির ভাষা, বক্তব্য ও ছন্দ অপূর্ব। কাব্যের নাম 'বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ'। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত এ কবির জীবনে নেই কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা। তার একটাই ইচ্ছা- জীবন সায়াহ্নে একবার বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তার স্বরচিত কাব্যটি নিজ কণ্ঠে পাঠ করে শোনাতে চান।

অবহেলিত এই কবির সঙ্গে সম্প্রতি দেখা হয় দেওয়ানগঞ্জের সানন্দবাড়ী বাজারে। কৃষ্ণচূড়ার মোড়ে ভ্যান চালানোর অবসরে অগণিত মানুষের ভিড়ে তার স্বরচিত সুবৃহৎ ও নন্দিত কবিতাটি পাঠ করে শোনাচ্ছেন। সুরেলা কণ্ঠে ছন্দময় বৃহৎ কবিতা 'বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ' পাঠ মগ্নচিত্তে শুনছেন শ্রোতারা। কবিতার ভাষা, ছন্দ ও নান্দনিকতা মুগ্ধ করার মতো।

খানিক পরে থেমে যায় কবির স্বরচিত কবিতা পাঠ। শ্রোতারা চলে যান একে একে। কথা হয় কবির সঙ্গে। কবি বললেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে তিনি এ কবিতাটি লিখছেন। বিভিন্ন সময় এতে সংযোজন বিয়োজন করেছেন। তার এক ছেলে। সেও তার মতো ভ্যান চালায়। তার পৃথক সংসার। মেয়ে তিনজনকে বিয়ে দিয়েছেন। সংসারে স্ত্রীসহ তারা দুজন মানুষ। জীবনে বেশি কিছু চাওয়ার নেই। ভ্যান চালিয়ে কোনো রকম ডাল-ভাত আর মোটা কাপড় হলেই চলে বেশ।

তিনি বলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন। ভালোবাসেন তার আদর্শকে। তাই 'বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ' কবিতাটি রচনা করেছেন। তার একটাই  চাওয়া, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিজ কণ্ঠে কবিতাটি একবার পাঠ করে শোনাতে চান।

স্থানীয়রা জানান, বঙ্গবন্ধুপাগল কবি আবু সাইদ খান সারা জীবনে ওই কাব্যটি রচনা করেছেন। ভ্যান চালানোর ফাঁকে ফাঁকে উপস্থিত জনতাকে সুর করে পাঠ করে শোনান তার স্বরচিত কবিতা। অনেক সময় ভ্যান চালানো অবস্থায় যাত্রীদের কবিতা পাঠ করে শোনান। তার কবিতায় উঠে এসেছে '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা, ভুট্টো ও টিক্কা খানের কুকীর্তি, ১১টি সেক্টরের যুদ্ধকালীন স্মরণীয় ঘটনা, আলবদর-আলশামস বাহিনীর বর্বরতা, ১৯৭৫-এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

তার কবিতা শুনে মুগ্ধ হন সবাই। মুগ্ধ হন নেতাকর্মীরাও। তাই তার কবিতা শুনে অনেক নেতাকর্মী তাকে অনেক আশার বাণী শুনিয়েছেন। বাস্তবে তা শুধু আশ্বাসই রয়ে গেছে।

অবহেলিত কবি আবু সাইদ খান জানান, তার কবিতায় মুগ্ধ হয়ে সাবেক তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ তাকে একটি মোটরচালিত ভ্যান কিনে দিয়েছেন। সে ভ্যানই এখন কবির জীবন-জীবিকার সম্বল। দরিদ্র হলেও কারও কাছে কিছু চান না তিনি। শুধু চান তার স্বরচিত কবিতাটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একবার স্বকণ্ঠে পাঠ করে শোনাতে।

মন্তব্য করুন