চরফ্যাসনের বুড়াগৌরাঙ্গ খাল রসূলপুর ইউনিয়নের ভাসানচর এবং নজরুল নগর ইউনিয়নের আর কলমী ও চর আর কলমী গ্রামের প্রায় ২০ হাজার বাসিন্দাকে যেন অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ধ্বংস করে দিয়েছে দুই হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। বুড়াগৌরাঙ্গ খাল দিয়ে বিচ্ছিন্ন এ দুটি গ্রামের ছেলেমেয়েরা বংশ পরম্পরায় লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেড়ে উঠেছে। গ্রামের মানুষ বাঁশ-গাছের সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে ২০০ ফুট প্রশস্ত এ খাল পারাপার হচ্ছে।

সরেজমিন জানা যায়, ঝুঁকিপূর্ণ এই সাঁকো পার হয়ে পড়ালেখা করতে গিয়ে সাঁকো থেকে পড়ে ফরাজিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থী সুরাইয়ার মৃত্যু হয়েছে। ওই দুর্ঘটনার পর আতঙ্কে আর কলমী ও চর আর কলমী গ্রামের কয়েকশ শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়েছে। আর কলমী ও চর আর কলমী গ্রাম দুটির আশপাশে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় শিশুরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

জানা গেছে, রসূলপুর ইউনিয়নের ভাসানচর গ্রাম। প্রায় সাত হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই গ্রামের মাঝ দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে বয়ে গেছে মায়া নদীর শাখা খাল বুড়াগৌরাঙ্গ। এই খালের পূর্বপাড়ে ফরাজিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং রসূলপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ভাসানচর গ্রামের অর্ধেকটা বুড়াগৌরাঙ্গ খালের পশ্চিম পাড়ে। ভাসানচর গ্রামের পশ্চিম পাশে আর কলমী এবং চর আর কলমী গ্রাম। আর কলমী এবং চর আর কলমী গ্রাম দুটি নজরুল নগর ইউনিয়নের অংশ। প্রায় আট হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত আর কলমী এবং সাত হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত চর আর কলমী গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এই গ্রাম দুটির উত্তর-দক্ষিণ এবং পশ্চিম দিকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় ওই গ্রামের শিশু-কিশোরদের শিক্ষার শেষ ঠিকানা বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর পূর্বপাড়ের ফরাজিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং রসূলপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। কিন্তু এই দুটি বিদ্যালয়ে বিদ্যা অর্জন করতে শিক্ষার্থীদের পার হতে হচ্ছে বুড়াগৌরাঙ্গ খালের ওপর ২০০ ফুট দীর্ঘ সাঁকো।

ভাসানচর গ্রামের প্রবীণ কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, বুড়াগৌড়াঙ্গের শাখা খাল নজরুল নগর ইউনিয়নের আর কলমী, চর আর কলমী এবং রসূলপুর ইউনিয়নের ভাসানচর গ্রামের একটা অংশকে উপজেলার মূল ভূখণ্ডের সড়ক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ১৯৮৫ সালে এই বুড়াগৌরাঙ্গ শাখা খালের উৎপত্তির পর প্রায় দুই যুগ স্থানীয়রা খেয়া নৌকায় এ খাল পার হতেন। ২০০৮ সালে দুই পাড়ের তিন গ্রামের

মানুষ নিজস্ব উদ্যোগে বাঁশ-গাছ দিয়ে খালের ওপর দীর্ঘ সাঁকো তৈরি করে নেয়। ওই সাঁকো এখনও তিন

গ্রামের ২০ হাজার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র অবলম্বন হয়ে আছে।

চর আর কলমী গ্রামের সাবেক মেম্বার জাহাঙ্গীর আলম জানান, নজরুল নগর ইউনিয়নের এই দুটি গ্রামে ও এর আশপাশে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় বুড়াগৌরাঙ্গ খালের ওপারে ফরাজিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং রসূলপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ই গ্রামের শিক্ষার্থীদের শেষ ভরসা। কিন্তু প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ বাঁশ-গাছের সাঁকো পারাপারে শিশুরা জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে। জীবন বাজি রেখে শিক্ষা অর্জনে বেশিরভাগ শিশু ও তাদের অভিভাবক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে গ্রামের বেশিরভাগ শিশু প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেড়ে উঠছে।

রসূলপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান সেলিম জানান, কেউ শিক্ষার জন্য জীবনের ঝুঁকি নেয় না। আর কলমী, চর আর কলমী এবং ভাসানচর গ্রামের মানুষও শিক্ষার জন্য নিজেদের ছেলেমেয়েদের খরস্রোতে ভাসিয়ে দিতে চান না। একটি খাল, একটি সাঁকো প্রায় দুই হাজার শিশুর শিক্ষাজীবনের প্রবাহকে রুদ্ধ করে রেখেছে। সাঁকো থেকে পড়ে সুরাইয়ার মৃত্যুর পর অধিকাংশ শিশু স্কুল ছেড়েছে। পাশাপাশি যুগ যুগ ধরে তিনটি গ্রামের ২০ হাজার মানুষ চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে।

ভাসানচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফেরদাউসি বেগম জানান, এক সাঁকো বিদ্যালয়ের অর্ধেক শিক্ষার্থী কেড়ে নিয়েছে। শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়েছে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী।

রসূলপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম জানান, তিনটি গ্রামের ২০ হাজার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সাঁকোর স্থানে সেতু নির্মাণ করা জরুরি। স্থানীয় সংসদ সদস্য অবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব সাঁকোর স্থানে সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন।

নজরুল নগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রুহুল আমিন হাওলাদার জানান, এ শতাব্দীতে বিদ্যালয়শূন্যতা এবং সেতুর অভাবে দুটি গ্রামের মানুষের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ ছাড়াই বেড়ে ওঠাটা অবিশ্বাস্য, অথচ সত্য।

উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মোশারেফ হোসেন জানান, দুর্গম যোগাযোগের কারণে এত বছরেও সাঁকো এলাকায় বুড়াগৌরাঙ্গ খালের ওপর সেতু নির্মাণ করা যায়নি। এ বছর সেতুর জন্য বরাদ্দ চেয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।

মন্তব্য করুন