কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ৫০ শয্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালে কর্মরত দু'জন চিকিৎসকের মধ্যে একজন প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। বাকি একজন দিয়েই চলছে উপজেলার সাড়ে তিন লাখ মানুষের সেবা। পাশাপাশি রয়েছে ওষুধের সংকটসহ নানাবিধ সমস্যা। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এলাকাবাসী।

জানা গেছে, চার বছর আগে ৫০ শয্যা হাসপাতালটি উদ্বোধন করা হলেও চিকিৎসক নিয়োগ দেয়নি সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইকো মেশিন নেই। ইসিজি মেশিন থাকলেও কার্ডিওগ্রাফার না থাকায় তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ডেন্টাল চেয়ারটিও ভাঙা। অনেক সময় দাঁড় করিয়ে রোগীর দাঁত ফেলা হয়। দু'জন প্যাথোলজিস্টের মধ্যে একজন কোনোরকম কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ক্যাশিয়ার পদটিও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বহির্বিভাগে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী সেবা নিতে আসেন। চিকিৎসক ও ওষুধ না পেয়ে অনেকেই ফিরে যান। হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, কার্ডিওলজিস্ট, অর্থোপেডিক, শিশু বিশেষজ্ঞ, অ্যানেসথেসিয়া, সার্জারি, নাক, কান, গলা, চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞসহ ২০ চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে বছরের পর বছর। অপারেশন থিয়েটারটিও প্রায় এক যুগ ধরে বন্ধ রয়েছে। হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারের জন্য আনা একটি এসি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তার বাসায় লাগিয়েছেন।

উপজেলার বড়হাটি গ্রামের গোপাল ঋষির স্ত্রী পুতুল ঋষি জানান, ডাক্তার চার ধরনের ওষুধ লিখে দিয়েছেন। ফার্মেসি থেকে দুই ধরনের দেওয়া হয়েছে। উপজেলার রাবারকান্দি গ্রামের আব্দুল জব্বার জানান, ডাক্তার কয়েক ধরনের ওষুধ লিখে দিলেও ফার্মেসি থেকে শুধু গ্যাসের ওষুধ দিয়েছে। অন্য ওষুধ বাজার থেকে কিনতে বলেছে।

উপজেলার উছমানপুর গ্রামের আমির হোসেনের স্ত্রী অঞ্জনা আক্তার, শোভারামপুরের জসীম মিয়ার স্ত্রী রানী আক্তার জানান, সকাল ১১টার মধ্যে হাসপাতালে এলে দু-একটি ওষুধ পাওয়া যায়। পরে এলে তাও পাওয়া যায় না। ওয়ার্ডের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা। বিছানার চাদর ধোয়া হয় না, মশারি নেই। চিকিৎসকরা শত শত রোগী দেখতে হিমশিম খাচ্ছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সিনথিয়া তাসমিন বলেন, এই হাসপাতালে একজন ডাক্তার আছেন। বিভিন্ন সাব-সেন্টার থেকে ডাক্তার এনে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত ওষুধ আছে। রোগীরা কেন ওষুধ পাচ্ছে না- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, হাসপাতালে স্টাফ ও এলাকার প্রভাবশালীদের অনেকেরই বাইরে থেকে ওষুধ কেনার মতো সামর্থ্য থাকলেও এখান থেকে বিনামূল্যে ওষুধ নিতে আসেন। এ অনিয়ম বন্ধ করা হয়েছে। মূলত তাদের কারণেই দরিদ্ররা মাঝেমধ্যে বঞ্চিত হয়। নিজ বাড়িতে হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ এসি লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, স্টোর রুমে পড়ে থেকে এসিটি নষ্ট হয়ে যায়। সেটি মেরামত করে বাসায় লাগিয়েছি। ওটি চালু হলে এসিটি সেখানে লাগিয়ে দেওয়া হবে।

এদিকে চলতি বছরের জুন মাসে ৪৮ লাখ টাকার টেন্ডার হয়। ৭০ হাজার মোনাস ট্যাবলেটের মধ্যে মাত্র পাঁচ হাজার ট্যাবলেট হাসপাতালে এসেছে। ফ্রেক্সো, ফেনাডিল, ওমিওপ্রাজল ও সেপোরেক্সিনসহ অনেক মূল্যবান ওষুধ ও ফার্নিচার এখন পর্যন্ত হাসপাতালে পৌঁছায়নি। হাসপাতালের তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বর্তমানে বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. জালাল উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, এগুলো রিসিভ করার দায়িত্ব আরএমও মুশফিকুর রহমানের। তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এ বিষয়ে আরএমও মুশফিকুর রহমান জানান, মোটামুটিভাবে সব ওষুধই এসেছে। তবে হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট সুষমা তরফদার জানান, আমি অক্টোবরের ২০ তারিখ থেকে ফার্মেসির দায়িত্বে আছি। আমি আসার পর থেকে স্টকে মোনাস ট্যাবলেট পাইনি।

সিভিল সার্জন ডাক্তার মজিবুর রহমান বলেন, ওষুধ কম এসেছে বলে আমার জানা নেই। আগের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বলতে পারবেন। ডাক্তার নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষকে হাসপাতালের সমস্যার বিষয়ে জানানো হয়েছে। হাসপাতালের এসি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বাসায় লাগাতে পারেন না- এটা অনিয়ম। বিষয়টি জেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন